সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

সাবধান! টেলিগ্রাম গ্রুপে ‘ইনভেস্ট’ করছেন? ব্যাংকারের ১ কোটি টাকা খোয়ানোর ঘটনাটি পড়ুন।

Spread the love

অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট এবং ঘরে বসে পার্ট-টাইম জবের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। সম্প্রতি এমনই এক চক্রের সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। টেলিগ্রাম অ্যাপ ভিত্তিক এই প্রতারণার মাধ্যমে এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৩০৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়।


​গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম মো. নাদিম (৩২)। গত ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে রাজধানীর নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিআইডির একটি বিশেষ দল। নাদিমের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা থানার দক্ষিণকান্দি (গোভিন্দপুর ইউনিয়ন) এলাকায়। তার পিতার নাম মো. কায়েস মিয়া।


​যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসারের হোয়াটসঅ্যাপে আসা একটি বার্তার মাধ্যমে। অজ্ঞাত এক নম্বর থেকে ‘নাজনীন’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নিজেকে ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ‘আপওয়ার্ক’ (Upwork)-এর প্রতিনিধি দাবি করেন। তিনি ভুক্তভোগীকে ঘরে বসে পার্ট-টাইম কাজের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের প্রস্তাব দেন। সরল বিশ্বাসে ওই ব্যাংক কর্মকর্তা প্রস্তাবে রাজি হন।


​প্রথমে বিশ্বাস অর্জনের জন্য ইউটিউব সাবস্ক্রিপশনসহ ছোটখাটো কিছু অনলাইন টাস্ক দেওয়া হয়। কাজ শেষে ভুক্তভোগীর বিকাশ নম্বরে প্রথমে ১৫০ টাকা এবং পরবর্তীতে ২,১০০ টাকা পাঠিয়ে তার আস্থা অর্জন করে চক্রটি। এরপর তাকে ‘@upworkfrontdesk2013’ নামক একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হয়। সেখানে চক্রের অন্য ভুয়া সদস্যরা নিয়মিত কাজ করে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জনের মিথ্যা স্ক্রিনশট ও তথ্য শেয়ার করতে থাকে, যা দেখে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
​বিনিয়োগের নামে ধাপে ধাপে টাকা আত্মসাৎ
প্রতারক চক্রটি পরবর্তী ধাপে ভুক্তভোগীকে বড় লাভের আশা দেখিয়ে ‘ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট’ (Crypto Account) খোলার জন্য ২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করতে বলে। এরপর জানানো হয়, আরও ৩,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে তার ব্যালেন্স ৭,০০০ টাকা দেখাবে এবং তিনি সেই টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। টাকা পাঠানোর পর তাকে ‘ভিআইপি টাস্ক গ্রুপ’-এ (VIP-TASK GROUP) যুক্ত করা হয়, যার অ্যাডমিন হিসেবে ‘হামজা’ (Hamza) নামের একটি প্রোফাইল সক্রিয় ছিল।


​গ্রুপে দেখানো হয় যে সবার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হচ্ছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে টাকা উত্তোলনের সময়। ভুক্তভোগী টাকা তুলতে চাইলে তাকে জানানো হয়, ক্যাশ আউটের জন্য আরও ১৫,৮০০ টাকা দিতে হবে। এভাবে একের পর এক নতুন টাস্ক, বড় লাভের লোভ এবং ভুয়া ব্যালেন্স দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোট ১ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৩০৫ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।


​মামলা ও গ্রেফতার
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা ডিএমপির লালবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৪, তারিখ: ২১/০৫/২০২৫, ধারা: ৪০৬/৪২০/৩৪ পেনাল কোড)। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্তকারী দল প্রতারক চক্রের অবস্থান শনাক্ত করে এবং নাদিমকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও এনআইডিসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়।
​সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের অন্য পলাতক সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
​সিআইডির সতর্কতা
সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে সিআইডি কিছু পরামর্শ দিয়েছে:
অনলাইনে সহজে বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে বিশ্বাস করবেন না।
যেকোনো আর্থিক লেনদেনের আগে প্রতিষ্ঠানের উৎস ও পরিচয় নিশ্চিত হোন।
কেউ প্রতারণার শিকার হলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিকটস্থ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে অবহিত করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *