মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু ক্ষমতার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল দেশের অর্থনীতির নড়বড়ে অবস্থা। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, বিনিয়োগে দীর্ঘ ভাটা, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদের হার সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক চাপ এখন নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঁজিবাজারে এখনো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরেনি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে আয় কমছে, আর বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ।সরকারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা।
এই সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে আয়কর খাতে। লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি ঘাটতি ২৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। ব্যবসায়িক মুনাফা কমে যাওয়া এবং নতুন বিনিয়োগ না বাড়ায় কোম্পানি ও ব্যক্তি উভয় পর্যায়ের কর আদায় কমেছে।আমদানি খাতেও পরিস্থিতি ভালো নয়।
শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের গতি কমে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানি হ্রাস পেয়েছে। ফলে ৭৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে মাত্র ৬২ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা ঘাটতি ১৫ হাজার ৬৮৩ কোটি।ভোগ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভ্যাটে। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ভ্যাট আরোপ থাকলেও আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২৭৫ কোটি ঘাটতি ১৫ হাজার ৫০৬ কোটি।ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থনীতির গতি ফেরাতে হলে আগে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুর ভাষ্য, ব্যবসার টার্নওভার না বাড়লে রাজস্ব বাড়বে না। আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক না থাকলে বড় বিনিয়োগ আসবে না। করনীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সরকারের দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি হিসাবে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৮ শতাংশ। বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় খরচ বাড়লেও আয়ের বৃদ্ধি সেই হারে হয়নি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হার বজায় রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তবে এখনো প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি মিলেনি।অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি, কম বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল বাজার এই চার সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করেই নতুন সরকারকে পথচলা শুরু করতে হবে। দ্রুত আস্থা ফেরানো না গেলে অর্থনীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

