মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে এলেই মাদকের চাহিদা বেড়ে যায় এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদকের বাজার চাঙা হয়ে উঠেছে। বাড়তি মুনাফার আশায় মাদক কারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে সীমান্তপথে পাচার জোরদার করেছে। প্রতিদিন নানা কৌশলে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান দেশে ঢুকছে এবং সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।এই প্রেক্ষাপটে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। এ বিষয়ে সব বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ না করতে বলা হয়েছে এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ মাদক কেনাবেচা, অপব্যবহার ও পাচার রোধে নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন সময়ে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান বেড়ে যায়। পেশিশক্তি প্রদর্শনে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি কালো টাকার প্রবাহ বাড়ায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনও বৃদ্ধি পায়। এসব বিবেচনায় সীমান্তবর্তী ৩২ জেলার ৯৬টি থানায় বিশেষ টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে যাতে সীমান্তের ফাঁক গলে মাদকের চালান ঢুকতে না পারে।একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩৮৬টি পয়েন্ট দিয়ে মাদক দেশে প্রবেশ করে।
ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজার বড় অংশ আসে ভারত থেকে, আর ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে। রাজধানীসহ সারাদেশে ইয়াবার চাহিদা বাড়ার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। কক্সবাজার ও আশপাশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে বড় বড় ইয়াবার চালান ঢুকছে মিয়ানমারের সাবাইগন, তমব্রু, মংডুসহ একাধিক পয়েন্ট এবং টেকনাফের সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়া, বালুখালী, বান্দরবানের ঘুমধুম প্রভৃতি পথ ব্যবহৃত হচ্ছে।ডিএনসির টেকনাফ বিশেষ জোনের সহকারী পরিচালক কাজী দিদারুল আলম জানান, নির্বাচন সামনে রেখে ইয়াবা প্রবেশ ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান ও টহল চলছে। বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ভারতীয় সীমান্তের সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরসহ আসাম ও মেঘালয় ঘেঁষা এলাকা দিয়ে মাদক ঢুকছে। পূর্ব সীমান্তে আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম থেকে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনী হয়ে পাচার হচ্ছে। ফেনসিডিল বেশি আসে কুড়িগ্রাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্ত জেলা দিয়ে, আর গাঁজা ঢোকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেট বিভাগসহ উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক পথে।ডিএনসির পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে সংস্থাটি ৯১ হাজার ৩৮৪টি অভিযান চালিয়ে ২৫ লাখের বেশি ইয়াবা, ৭ হাজার ৭৩০ কেজি গাঁজা ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হেরোইন ও ফেনসিডিল উদ্ধার করে।
সে বছর মামলা হয় ২১ হাজার ৯১৩টি। ২০২৫ সালে অভিযান বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩টিতে; উদ্ধার হয় ৪৭ লাখের বেশি ইয়াবা, ৬ হাজার ৯৩৮ কেজি গাঁজা ও অন্যান্য মাদক, মামলা হয় ২৮ হাজার ৪০৯টি।নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান আরও কঠোর করার প্রস্তুতি নিয়েছে কর্তৃপক্ষ লক্ষ্য একটাই, মাদকের বিস্তার রোধ করে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখা।

