মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপ্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। প্রার্থীদের বৈধতা যাচাই, আচরণবিধি লঙ্ঘনে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে প্রশাসনের এক ধরনের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শুধু নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেই নয়, সাধারণ প্রশাসনিক কার্যক্রমেও এই দুর্বলতা দৃশ্যমান।সম্প্রতি যশোর কারাগারে বন্দী বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি না পাওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও, এর আগে প্যারোল নিয়ে জেলা প্রশাসনের ব্যাখ্যা ভুল জেলায় আবেদন, বন্ধের দিন, আবেদনপত্র না পাওয়া সব মিলিয়ে প্রশাসনিক অদক্ষতার উদাহরণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনে করছেন, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিক মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।নির্বাচন সামনে রেখে সরকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ ডিসি ২৭ ব্যাচের এবং ইউএনওরা মূলত ৩৭ ব্যাচের কর্মকর্তা।
ফলে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার মতো সংবেদনশীল দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞতার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে। যদিও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষ্য—অভিজ্ঞতা কাজ করতে করতেই আসে তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই অভিজ্ঞতার অভাব সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল ব্যবস্থাপনায় রূপ নিচ্ছে।গত জানুয়ারিতে কয়েকজন ইউএনওর বদলি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত বদল প্রশাসনের ভেতরের অস্থিরতাকেই সামনে এনেছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এমন সিদ্ধান্তহীনতা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবল ও কার্যকারিতা দুটোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক চাপ সামলাতে পারছেন না।
প্রার্থী বা দলীয় কর্মীদের অসদাচরণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে নীরবতা বা শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। ফলে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, বগুড়াসহ বিভিন্ন উপজেলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মাঠপ্রশাসনের এই দুর্বলতার উদাহরণ।এমনকি কোথাও কোথাও প্রভাবশালী মহলের চাপে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বদলি করানোর অভিযোগও উঠেছে, যা প্রশাসনের ভেতরে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির দলীয় ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনায় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না থাকা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিষ্ক্রিয়তা ভবিষ্যৎ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।শুধু নির্বাচন নয়, সাধারণ প্রশাসনিক আচরণেও অপেশাদারিত্ব চোখে পড়ছে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার, নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ, ক্ষমতার শালীন প্রয়োগ এসব ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ বাড়ছে। নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ সম্বোধন নিয়ে পুরোনো নির্দেশনা বাতিল হলেও মাঠপর্যায়ে আচরণগত জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। কোথাও কোথাও কর্মকর্তাদের দাম্ভিকতা ও অসংযত আচরণ প্রশাসনকে বিব্রত করছে।
এবারের নির্বাচনের আগে ডিসি পদে এসপিদের চেয়ে জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভেঙে এই নিয়োগ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কার্যকারিতা ও নেতৃত্বে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। অন্তত ৩০ জেলায় ডিসিরা এসপিদের চেয়ে জুনিয়র হওয়ায় সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা নির্বাচনী সময়ে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।সব মিলিয়ে নির্বাচনকালীন মাঠপ্রশাসন আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখে।
অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা, রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক ভারসাম্যহীনতা এই চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়বে। শক্ত, নিরপেক্ষ ও পেশাদার মাঠপ্রশাসন গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

