মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। অথচ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারী মাত্র ১০৭ জন যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান নির্বাচন ও রাজনীতিতে নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।ইসলামী দলগুলোয় নারী প্রার্থী নেই, বড় দলগুলোও পিছিয়েঃ মনোনয়ন তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক ইসলামী দলে একজনও নারী প্রার্থী নেই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিসসহ অনেক দল নারী প্রার্থী না দেওয়ার একই অবস্থান নিয়েছে।
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ৩০০ আসনের বিপরীতে মাত্র ৭ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে, যা শতাংশের হিসাবে আড়াই শতাংশেরও কম। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিএনপির অন্তত ১৫ জন নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪৭টি আসনে প্রার্থী দিলেও নারী প্রার্থী রয়েছে মাত্র ৩ জন।অধিকাংশ দলেই নারী প্রতিনিধিত্ব নেইঃ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৯টি দলে নারী প্রার্থী রয়েছে। বাকি ৩২টি দলের প্রার্থী তালিকায় একজনও নারী নেই।
এই চিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারী নেতৃত্বের প্রতি অনীহারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও কম নারীঃ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৭৯ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ৪০ জন। দলীয় মনোনয়নের বাইরে নারীদের এই অংশগ্রহণ কিছুটা আশাব্যঞ্জক হলেও সামগ্রিক চিত্রে তা খুবই সীমিত।সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষিতঃ নির্বাচন কমিশনের সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু অধিকাংশ দলই সেই সুপারিশ মানেনি। নির্বাচনী খসড়া অনুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা আগের মতোই ৫০ থাকছে, যা নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মত বিশ্লেষকদের।নারী অধিকারকর্মীদের তীব্র হতাশাঃ নারী অধিকার সংগঠন ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা এই অবস্থায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সেমিনারে নারী নেতৃত্বের কথা বললেও বাস্তবে তা কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ নারী প্রার্থী পারিবারিক প্রভাবের কারণে মনোনয়ন পেয়েছেন, যা প্রকৃত ক্ষমতায়নের বার্তা দেয় না।নিজেরা করি-এর সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর চিন্তাধারা এখনো পশ্চাৎপদ। তারা নারীর মর্যাদা দিতে জানে না বা দিতে চায় না। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নীতিনির্ধারণী ফোরামের বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়ঃ বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে ভোটারের অর্ধেক নারী, সেখানে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এত কম হলে নারী অধিকার সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলো আইন না থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে নারী নেতৃত্ব বাড়াচ্ছে।
আর বাংলাদেশে আইন ও সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও দলগুলো তা মানছে না এটাই সবচেয়ে হতাশার বিষয়।তারা মনে করেন, নারী ক্ষমতায়ন শুরু করতে হবে নির্বাচনী রাজনীতি থেকেই। নইলে বক্তৃতা ও সেমিনারের বাইরে নারী নেতৃত্ব বাস্তবে আর এগোবে না।

