মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
২০১৮ সালের আলোচিত ‘রাতের ভোট’ বিতর্কের কারণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনানুগ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। এ উদ্দেশ্যে পুলিশ সদর দপ্তর ৭৩ দফা নির্দেশনাসংবলিত একটি বিশেষ বুকলেট প্রকাশ করেছে।নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে এই বুকলেট সরবরাহ করা হচ্ছে এবং দায়িত্ব পালনকালে এটি সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় নির্বাচনের সময় পুলিশের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মাঠপর্যায়ে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।পুলিশ সূত্র জানায়, ইউএনডিপি ও জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের সহায়তায় এক লাখ ৬০ হাজার বুকলেট মুদ্রণ করা হয়েছে। গত সপ্তাহেই দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার কার্যালয়, মহানগর পুলিশ ইউনিট এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শাখায় এসব বুকলেট পাঠানো হয়েছে।
নির্বাচনী দায়িত্বে যোগদানের আগে কমান্ড সার্টিফিকেট গ্রহণের সময় প্রতিটি পুলিশ সদস্য একটি করে বুকলেট পাবেন।পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা।
তিনি বলেন, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের জন্য এই নির্দেশনা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।নির্বাচনকালে পুলিশের করণীয়ঃ নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। ভোটারদের অবাধ ও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষা এবং কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাত না দেখানো পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।বিশেষ করে নারী, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপদে ভোট প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাল ভোট, সহিংসতা কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের চেষ্টা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।নির্বাচনকালে পুলিশের বর্জনীয়ঃ নির্দেশিকার বর্জনীয় অংশে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্টের কাছ থেকে খাবার, উপহার কিংবা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না।
প্রার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলা, রাজনৈতিক আলোচনা করা বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।এছাড়া ভোটারকে প্রভাবিত করা, পক্ষপাতমূলক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ, রাজনৈতিক মিছিলে অংশগ্রহণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মন্তব্য বা পোস্ট দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। দায়িত্বকালীন সময়ে অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা অপেশাদার আচরণ থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো সংবেদনশীল তথ্য, ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ না করা এবং ভোটের ফলাফল বা সম্ভাব্য বিজয়ী নিয়ে কোনো আলোচনা না করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতামতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের জন্য এ ধরনের সুস্পষ্ট নির্দেশিকা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
তাঁর মতে, যদি পুলিশ সদস্যরা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তাহলে তারা নির্বাচনে নিজেদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে পারবেন এবং নির্বাচন সবার কাছে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

