মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
সরকার সামগ্রিক ব্যয়ে সতর্কতা বজায় রাখলেও পরিচালন খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধি, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধ, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় আরও ফুলে উঠছে। এর ফলে মূল বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট না হলেও উন্নয়ন বাজেটে (এডিপি) আবারও কমানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেতন–ভাতা, সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি এই তিন খাতেই বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যায়।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নির্বাচনের প্রাক্কালে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে থাকায় অর্থনীতির গতি ফেরার আশা কম। এরই মধ্যে চলতি ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ এক হাজার ৯৮ কোটি টাকায়। প্রথম প্রান্তিকে সুদ ও ভর্তুকিতে ব্যয় হয়েছে ৫৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ৫৫ শতাংশেরও বেশি। বিপরীতে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ, যদিও এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একটি কারণ হলেও আরও বড় সমস্যা হলো উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়া এবং বরাদ্দের টাকা যথাসময়ে ব্যয় করতে না পারা। অপরদিকে পরিচালন ব্যয় কখনোই থেমে থাকে না ফলে এ খাতের চাপ বাড়তেই থাকে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা দফতরের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।বর্তমান আর্থিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকার উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় রাজস্ব ব্যয় বাড়লেও সামাজিক খাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমছে যা ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যদিও বর্তমান বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।ফেব্রুয়ারি মাসে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থ বিভাগ দ্রুত বাজেট সংশোধনের কাজ করছে। মন্ত্রণালয়গুলো সংশোধিত বরাদ্দ প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যা পর্যালোচনাধীন।
এদিকে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধি এসব কারণে পরিচালন ব্যয় আরও প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়বে।অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নির্বাচিত সরকার করবে; তারা শুধু কাঠামোর ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করবে। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্যও ব্যয় বাড়তে পারে। নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হাজার কোটি টাকার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
তদুপরি সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দিচ্ছে সরকার। এসব কারণে পরিচালন ব্যয় আরও বাড়ছে।নির্বাচনের আগে বাজেটের এই চাপ সরকারকে কঠিন আর্থিক সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে পরিচালন ব্যয় লাগামহীন, আর উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত।

