অপু আবুল হাসান,সম্পাদকীয়,নিউ ইয়ার ২০২৬ স্পেশাল:
২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস। পাকিস্তানের কাসুর শহরের একটি আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় সাত বছর বয়সী জয়নাব আনসারির নিথর দেহ। এই একটি ঘটনা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, বরং কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্রকে। বাধ্য করেছিল দেশের আইন পরিবর্তন করতে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও মুনতাহা কিংবা রুহির মতো শিশুদের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে অহরহ।
কিন্তু পাকিস্তানের সেই ঘটনা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলায় আমরা আসলে কতটা পিছিয়ে আছি?
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি। কোরআন শিক্ষার ক্লাসে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় জয়নাব। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পরিচিত এক ব্যক্তির হাত ধরে স্বাভাবিকভাবেই হেঁটে যাচ্ছে সে। এর ঠিক পাঁচ দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে উঠে আসে পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পাকিস্তানের জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে কাসুর শহর।
জনরোষের মুখে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্র নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়।
তদন্তে পুলিশের প্রাথমিক গাফিলতি ছিল স্পষ্ট। কিন্তু জনরোষের চাপে গঠিত হয় জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম বা জেআইটি। ১,১৮৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষার পর ২২ জানুয়ারি শনাক্ত করা হয় মূল হোতাকে। তার নাম ইমরান আলী, বয়স ২৪। তিনি ছিলেন জয়নাবের প্রতিবেশী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুলিশ এর আগে তাকে দুবার আটক করে ছেড়ে দিয়েছিল। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ইমরান আলী কেবল জয়নাবকেই হত্যা করেনি, সে একজন সিরিয়াল কিলার। এর আগে আরও অন্তত সাতজন শিশুকে একইভাবে হত্যা করেছিল সে।
বিচারে তাকে ২১টি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর জয়নাবের বাবার উপস্থিতিতে সেই রায় কার্যকর করা হয়।
তবে ইমরান আলীর ফাঁসির মাধ্যমেই ঘটনার সমাপ্তি ঘটেনি। জয়নাবের বাবার দাবি এবং সিভিল সোসাইটির আন্দোলনের ফলে ২০১৯ সালে পাকিস্তান পার্লামেন্টে পাস হয় ঐতিহাসিক জয়নাব অ্যালার্ট, রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি অ্যাক্ট। এই আইনের মাধ্যমে গঠন করা হয় একটি বিশেষ এজেন্সি। চালু করা হয় ১০৯৯ টোল-ফ্রি নাম্বার। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নাম্বারে জানালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশ, টেলিকমিউনিকেশন কর্তৃপক্ষ এবং গণমাধ্যমের কাছে বার্তা চলে যায়। ফলে অপরাধী পালানোর আগেই শিশুটিকে উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সম্ভব হয়। এই সিস্টেমে পুলিশের গাফিলতি থাকলে তাদের চাকরিচ্যুতির বিধানও রাখা হয়েছে। একে বলা হয় প্রো-অ্যাক্টিভ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শিশু অপহরণ বা হত্যার ঘটনা ঘটার পর আমরা কেবল অপরাধীর শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হই। একে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পেনাল পপুলিজম। কিন্তু অপরাধ যাতে না ঘটে, তার জন্য জয়নাব অ্যালার্টের মতো কোনো স্বয়ংক্রিয় বা কার্যকর সিস্টেম আমাদের নেই। সম্প্রতি সিলেটের কানাইঘাটে শিশু মুনতাহা কিংবা জয়পুরহাটে শিশু রুহির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র শিশুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করতেই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যা শিশুর জীবন বিপন্ন করে তোলে।
পাকিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্র যদি নিজেদের বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশি কার্যক্রমে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? অপরাধীকে কেবল ফাঁসি দিলেই হারানো সন্তান ফিরে আসে না। প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যা শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে।
জয়নাব আনসারি মামলা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বিচার বা শাস্তিই শেষ কথা নয়, আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধ প্রতিরোধ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করা। নিউজবিডি২৪ এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এখনই যদি জয়নাব অ্যালার্টের আদলে কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে গ্রহণ না করা হয়, তবে মুনতাহার মতো আরও অনেক শিশুর প্রাণ ঝরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সোর্স (Sources)
১. ডন নিউজ পাকিস্তান (আর্কাইভ ২০১৮)।
২. বিবিসি নিউজ (জয়নাব আনসারি মার্ডার কেস কভারেজ)।
৩. পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি রেকর্ডস (জয়নাব অ্যালার্ট অ্যাক্ট ২০১৯)।
৪. মারুফ হায়াত ডকুমেন্টারি ও রিসার্চ পেপার।

