খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় জলের স্বাদ যেন পরিবর্তন করছে — মিষ্টি থেকে লবণাক্ত হচ্ছে সবকিছু। গভীর টিউবওয়েল, পুকুর বা নদীর পানি — সবই নোনাজলে ভরপুর। এই নোনাজল জলে ব্যবহার করা হচ্ছে জামা কাপড় ধোয়ার জন্য, বিশেষ করে মেয়েদের মাসিকের সময়। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটারি প্যাডের অভাব, পাশাপাশি সামাজিক ঘাটতি বেড়ে তুলেছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি।২০২৩-২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনা জেলার কয়রা উপজেলাতে প্রায় ৭২.3 শতাংশ নারী-মেয়েরা জামা কাপড় ব্যবহার করে এবং সেটি রিনস করার সময় নোনাজল ব্যবহার করেন। এই অভ্যাস ত্বকের সমস্যা, জরায়ুর সংক্রমণ ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতার মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, সমস্যা শুধু কাপড়ের ঘোরপথেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক কিশোরী ও তরুণী গর্ভনিরোধক পিল অনিয়ন্ত্রিতভাবে খেয়ে মাসিককে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে – যাতে নোনাজলের সংস্পর্শ ও সংক্রমণ এড়ানো যায়। এমন অভ্যাসের ফলে হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে, মাসিক অনিয়মিত হচ্ছে, পরবর্তী প্রজনন সমস্যা বাড়ছে; এমনকি মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা তীব্র হচ্ছে কারণ — উপকূলের পানি এখন ধীরে ধীরে লবণাক্ত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে নিচু এলাকার টিউবওয়েলগুলোতে মিঠ্যা পানি আর নেই। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপি-সহ বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, দেশব্যাপী স্যানিটারির প্যাড ব্যবহার বাড়লেও উপকূলের এলাকা এখনও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে; সেখানে এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ নারী পুরনো কাপড় ব্যবহার করতে বাধ্য। একই সঙ্গে মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না সময়মতো বা ক্লিন-স্যানিটি না থাকার কারণে; শিক্ষাগত উন্নয়ন থমকে যাচ্ছে, আত্মবিশ্বাস ঘাটছে। কিন্তু পুরোপুরি নিডার মেঘ নয়। ২০২৫ সালে ব্র্যাক ও ইউএনএফপি মিলিতভাবে শুরু করেছে “মেনস্ট্রুয়াল কাপ ক্যাম্পেইন”, যাতে কম পানি ব্যবহার করে নিরাপদভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনা করা যায়। সরকার “জেন্ডার রেসপন্সিভ কোস্টাল অ্যাডাপ্টেশন” প্রকল্পের আওতায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাংক বিতরণ শুরু করেছে উপকূলীয় এলাকায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ — সচেতনতার অভাব, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পণ্য না থাকা, উপকূলীয় এলাকা যেখানে পানির লবণাক্ততা অনেক বেশি — সেখানে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। মেয়েদের, নারী ও কিশোরীদের যেন নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা, আত্মমর্যাদায় জীবন যাপন—এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।প্রধান নির্দেশনা ও সুপারিশ:১. কার্যকরভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বাড়ানো হোক;২. নল-নতুন প্রযুক্তি মিক্সড সলিউশন — যেমন পনড স্যান্ড ফিল্টার, রিভার্স অস্কামোসিস, স্লাইডিং পানির ব্যবহারের বিকল্প খুঁজে বের করা;৩. ঔষধ-বৈষম্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করতে স্কুল ও কমিউনিটি-লেভেলে শিক্ষা কার্যক্রম;৪. স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও জনস্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ, যাতে মেয়েরা নিরাপদ পদ্ধতিতে মাসিক নিয়ে পরামর্শ নিতে পারে;৫. স্যানিটারি প্যাড সহ সাশ্রয়ী, পরিবেশ বান্ধব বিকল্পের উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করা।

