ডেস্ক রিপোর্ট
newsbd24live:
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এবার সনাতন পদ্ধতির বদলে অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের ব্যবহার শুরু করেছে দেশটির সরকার। সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে কঠোর হস্তে দমন করতে ড্রোন নজরদারি থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট জ্যামিং পর্যন্ত সব ধরনের উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে।
তেহরানের রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের ওপর নজরদারি চালাতে লো-ফ্লাইং বা নিচু দিয়ে উড়া ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, যারা রাস্তায় না নেমে ঘরের জানালা দিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন, তাদের শনাক্ত করতেও এই ড্রোনগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি ইরানি পুলিশ কর্তৃক প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আবাসিক ভবনের জানালার পাশে ড্রোন হোভার করে স্লোগানরত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা হয়েছে ভীতিকর মিউজিক এবং সেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে নিরাপত্তা বাহিনী সেই সব ভবন চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের গ্রেফতার করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সরকার বর্তমান অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষকে গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সাথে হওয়া যুদ্ধের বর্ধিত অংশ হিসেবেই দেখছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিকে যুদ্ধের ‘ত্রয়োদশ দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং বিক্ষোভকারীদের বিদেশী এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ইরান এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স পরিচালিত ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা, যা সাধারণত বিধিনিষেধ এড়িয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দিতে সক্ষম, তাও এবার ইরানে কাজ করছে না। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে যে ধরনের সিগন্যাল জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল, ইরানও বিক্ষোভ দমনে একই ধরনের সামরিক গ্রেডের জ্যামার ব্যবহার করছে। ফলে বহির্বিশ্ব থেকে ইরান কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইন্টারনেট মনিটরিং গ্রুপ ‘নেটব্লকস’-এর প্রতিষ্ঠাতা আল্প টোকার জানান, ইরানের বর্তমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং স্বয়ংক্রিয়। ২০১৯ বা ২০২২ সালের বিক্ষোভের চেয়ে এবারের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী ও দ্রুতগামী।
বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার মাত্রাও এবার নজিরবিহীন। গত ১০ জানুয়ারি থেকে বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ার পর থেকে কয়েকশ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটি হতে পারে অন্যতম বড় দমনপীড়ন। সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মর্গে লাশের সারি এবং গ্রেফতারকৃতদের চোখ বাঁধা অবস্থায় লাইনে দাঁড় করানোর ফুটেজ প্রচার করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের একটি কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান সরকার অবশ্য বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর দায় নিতে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাড়াটে দাঙ্গাবাজরাই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। সরকারের পক্ষে বিশাল জনসমাবেশ আয়োজন করে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সমর্থন এবং হুঁশিয়ারি বিক্ষোভকারীদের পুনরায় উজ্জীবিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এবং দমনপীড়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

