শহীদুল ইসলাম শরীফ, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলা ক্যালেন্ডারের নিজস্ব ছন্দে প্রকৃতিতে এখন বিরাজ করছে হেমন্ত। শরৎ ও শীতের সন্ধিক্ষণে আসা এই ঋতু একাধারে বহন করে নবান্নের আনন্দ এবং আসন্ন শীতের নিস্তব্ধ আগমনী বার্তা।
প্রকৃতিতে এক স্নিগ্ধ, শান্ত ও বিষাদময় রূপের সঞ্চার করে হেমন্ত।
হেমন্ত: নবান্নের ঋতু ও কৃষকের হাসি
হেমন্তকে যথার্থই বলা হয় ‘নবান্নের ঋতু’। এই সময়ে মাঠ ভরে ওঠে সোনালী পাকা ধানে। নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসব, পিঠে-পুলি আর গ্রামীণ মেঠো সুর এই ঋতুর বাতাসের প্রধান আকর্ষণ।
কৃষকের মুখে তৃপ্তির হাসি এবং ধানের শিষের দোলায়িত রূপ হেমন্তের এক চিরায়ত ছবি। সকালের শিশির ভেজা সবুজ ঘাস আর তাতে সূর্যের প্রথম আলোর ঝিলিক এক অসাধারণ নান্দনিকতা সৃষ্টি করে।
কুয়াশা ও নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শরতের মেঘমুক্ত আকাশ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। বাতাসে অনুভূত হয় এক মৃদু শীতলতা, যা শীতের পূর্বাভাস। ভোরের প্রকৃতি আবছা কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা কাটলেও বাতাসে এক মায়াবী স্নিগ্ধতা থেকে যায়।
এই সময়েই গাছপালা থেকে পাতা ঝরার সূচনা হয়, যা প্রকৃতির ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য এবং জীবনচক্রের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। শুষ্ক পাতার মর্মর ধ্বনি যেন প্রকৃতির এক বিষাদময় সুর।
পরিযায়ী পাখির আগমন ও ফুলের রেশ
হেমন্তকালে জলাভূমিগুলোতে পরিযায়ী পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রাণের নতুন স্পন্দন দেখা যায়। যদিও বেশিরভাগ ফুলের মৌসুম শেষ হয়ে আসে, তবুও শিউলির মিষ্টি গন্ধ, গন্ধরাজ এবং দেবকাঞ্চনের মতো কিছু নির্দিষ্ট ফুলের দেখা মেলে।
বিশেষত, ঝরে পড়া শিউলি ফুলের স্তূপ সকালে এক অসাধারণ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। কবি বিচিত্রকুমার তাঁর ‘হেমন্তের প্রার্থনা’ কবিতায় এই ঋতুর অনুভূতিকে নিপুণভাবে ধরেছেন: ‘’হেমন্তের নীরবতায় যখন ভেঙে পড়ে ঝরা পাতা, আমার হৃদয়ে বাজে এক দীর্ঘ ক্লান্তির কথা’’।
শীতের প্রস্তুতি ও জীবনের চিরন্তন সত্য
হেমন্ত শুধু একটি ঋতু নয়, এটি শীতের আগমনের প্রস্তুতিপর্বও বটে। দিনের দৈর্ঘ্য কমে আসে, সন্ধ্যা নামে দ্রুত এবং রাতের শীতলতা বাড়ে। প্রকৃতি ধীরে ধীরে শীতের নিস্তব্ধতা ও নির্জনতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। এই পরিবর্তন আমাদের জীবনচক্রের এক চিরন্তন সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—সব কিছুরই শেষ আছে, আবার নতুন করে শুরুর সম্ভাবনাও আছে। তাই, হেমন্ত ধৈর্য, পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নীরব সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার এক অসাধারণ ঋতু।

