শহীদুল ইসলাম শরীফ, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা মহানগরী: স্বাভাবিক ক্লান্তি, অস্বাভাবিক উদারতা
রাজধানী ঢাকা শহর প্রতিদিনের চেনা ভিড়, তাড়াহুড়ো এবং নাগরিক ব্যস্ততার এক প্রতিচ্ছবি। এই যান্ত্রিকতা এবং ছুটে চলার মাঝেও মাঝেমধ্যে ঘটে যায় এমন কিছু ঘটনা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ মানবিকতার স্পর্শ এখনো ম্লান হয়ে যায়নি। সম্প্রতি ঢাকা শহরের কোনো এক এলাকায় ঘটে যাওয়া তেমনই এক ঘটনা অবাক করেছে অনেককেই, যা একইসঙ্গে জন্ম দিয়েছে এক মিষ্টি রহস্যের।
ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ, যিনি একদিন বাসে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। শাহবাগ পৌঁছানোর পর হেল্পারের ডাকে তাঁর ঘুম ভাঙে। ভাড়া দিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ভাড়া আগেই পরিশোধ করা হয়ে গেছে।
হেল্পার তাঁকে জানান, পাশের সিটে বসে থাকা এক মধ্যবয়সী অচেনা নারী নীরবে তাঁর ভাড়া মিটিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁকে না ডাকার জন্য হেল্পারকে অনুরোধও করেছেন।
তরুণটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তাঁর ভাষ্যমতে, “আমি কাউকে চিনতাম না। একজন অচেনা মানুষ এভাবে আমার ভাড়া দিয়ে যাবেন, তা ভাবতেই পারিনি।”
রহস্যময়ী নারীর সাথে আকস্মিক সাক্ষাৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি
কয়েকদিন পর সেই তরুণটির সঙ্গে ঐ একই স্থানে সেই নারীর আকস্মিক দেখা হয়ে যায়। তরুণটি ছুটে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তিনি অপরিচিত হয়েও এই কাজটি করেছিলেন।
প্রথম দিকে ওই নারী ঘটনাটি মনে করতে না পারলেও, সময় ও বাসের কথা বলার পর তাঁর মনে পড়ে। তিনি তরুণটিকে জানান: “আসলে তুমি এমনভাবে ঘুমাচ্ছিলে যে খুব মায়া লাগছিল। মনে হচ্ছিল কত জনম ধরে তুমি ঘুমাও না।”
তরুণটি যখন ভাড়া ফেরত দিতে চান এবং পরিচিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন নারীটির উত্তরটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মুচকি হেসে বলেন, “ধরো ভাই এর ভাড়া বোন দিয়েছে।”
পরিচিত হওয়ার প্রস্তাবও তিনি বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দেন। তাঁর শেষ কথা ছিল, “কী হবে পরিচয় হয়ে! খুব খুব ভালো থেকো ভাই। কেমন!” এরপরই তিনি দ্রুত ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যান। পেছন থেকে তরুণটি ডাকলেও তিনি আর ফিরে তাকাননি।
নিঃস্বার্থ কাজের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা
তরুণটি বুঝতে পারেন, এই নারী কোনো প্রতিদান বা পরিচিতি চাননি। তিনি শুধু নিজের মানবিক অনুভূতি থেকে কাজটি করেছিলেন এবং চাননি যে সেই সরলতা কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা বা কৃতজ্ঞতার জালে জড়িয়ে পড়ুক। এই নিঃস্বার্থ আচরণের মধ্য দিয়েই তিনি রেখে গেলেন এক অমূল্য শিক্ষা।
তরুণটি বলেন, “তিনি অদৃশ্য হলেন বটে, রেখে গেলেন এক গভীর রহস্য। এই দুনিয়ায় অনেক মানুষ আছেন, বুকভরা যাদের মায়া। মায়া ঢেলে রহস্য তৈরি করে হারিয়ে যান। যে রহস্য কোনোকালে খোলাসা হয় না বটে, তবে তিনি নিজের অজান্তেই অর্জন করে নিলেন এক সাগর সমান শ্রদ্ধা।”
ব্যস্ত শহরে কিছু মানুষ এখনো নিঃশব্দে মায়া বিলিয়ে যান, যা সম্পর্কের চেয়েও বড় মূল্যবোধের জন্ম দেয়।

