নিজস্ব প্রতিবেদক:
আন্দোলনরত ৮ দলের পূর্ব ঘোষিত বিভাগীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাসহ ৫ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, আমরা কেবল ৮ দলের বিজয় চাই না, আমরা চাই এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। তিনি বলেন, সেই আকাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হবে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে এবং চট্টগ্রাম থেকেই ইসলামের বিজয়ের বাঁশি বাজানো হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে কুরআনের বাংলাদেশ।
শুক্রবার দুপুর ২টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই মিছিলে মিছিলে লালদীঘি ময়দান পূর্ণ হয়ে যায়। দুপুরের পর এটি জনসমুদ্রে রূপ নেয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বিগত সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করেছে। রাস্তাঘাট তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করেছে। দেশের টাকা লুট করে সিঙ্গাপুরে ব্যবসা ফেঁসেছে। শাপলা চত্বরে অসংখ্য আলেমকে হত্যা করে তারা প্রচার করেছিল যে তারা রঙ মেখে শুয়ে ছিল। যারা রক্তাক্ত হাতে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের বিদায়ও হয়েছে রক্তাক্ত হাতে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার এতটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিল যে গাড়ি দিয়ে পালানোর সাহসও হারিয়ে ফেলেছিল। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবিকে অপকর্মে লাগানোর চেষ্টা করেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে বলেন, ফ্যাসিবাদ বিদায় নিলেও দেশ এখনো ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়নি। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর একটি গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি এখনো অব্যাহত আছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদকে নতুন করে আর দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। ইসলামী দলগুলোর ঐক্য জাতীয় সংসদ পর্যন্ত অটুট থাকবে। দাবি আদায় না হলে প্রয়োজনে আবারও ৫ আগস্টের মতো বিপ্লব সংঘটিত হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশ গরিব-দুঃখী ও মেহনতি মানুষের রক্তে গড়া। এখানে আর কোনো বনেদি প্রথা চলবে না। আমরা এ দেশের মালিকানা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কবর রচনা করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি দলীয় প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের বাক্স ভরার আহ্বান জানান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসকরা বদল হলেও বৈষম্য দূর হয়নি। ৫ আগস্টের হাজারো প্রাণের বিনিময়েও মানুষ পূর্ণ মুক্তি পায়নি। আগামীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে কেউ দশতলায় আর কেউ নিচতলায় থাকবে না, এই বৈষম্য আর হবে না। তিনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করে নির্বাচনের দাবি জানান।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এটিএম আজহারুল ইসলাম চট্টগ্রামকে ইসলামের ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ৮ দলের এই শক্তি ক্ষমতায় গেলে দেশ আপনারাই শাসন করবেন। কারো দাদাগিরিতে এ দেশ আর চলবে না। বাংলাদেশ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছাবে যেখানে বিদেশিরাও শিক্ষা গ্রহণ করতে আসবে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজী, জাগপার সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান সহ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বক্তারা ৫ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এছাড়াও সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে বলে সতর্ক করে দেন।

