সর্বশেষ
এপ্রিল ৭, ২০২৬

বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে যিনি এনেছিলেন গণতন্ত্র: আমাদের খালেদা জিয়া

Spread the love

কলামে ,অপু আবুল হাসান ,সম্পাদকীয়:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, গণতন্ত্রের মানসকণ্যা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। দীর্ঘ রোগভোগ, সংগ্রাম এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে। তাঁর এই বিদায়ে কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল না, বরং অবসান হলো এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের। যিনি একাধারে ছিলেন স্নেহময়ী মা এবং অন্যদিকে ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক।


​১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল ছিলেন নিতান্তই একজন সাধারণ গৃহবধূ। পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদারের আদরের এই মেয়েটির শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দিনাজপুরে। ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর জীবন ছিল আর দশজন সাধারণ বাঙালি নারীর মতোই। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিল এক ভিন্ন পথ।


​১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির চরম দুঃসময়ে দলের হাল ধরেন তিনি। ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় তাঁর আসল সংগ্রাম। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে তিনি রাজপথে আপোষহীন নেতৃত্ব দেন। গৃহবন্দিত্ব, গ্রেপ্তার এবং নানা প্রলোভন—কোনোকিছুই তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর সেই অনমনীয় মনোভাবের কারণেই জাতি তাঁকে আপোষহীন নেত্রী উপাধিতে ভূষিত করে।
​১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর শাসনামলেই দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। তিনি নারী শিক্ষার প্রসার, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে সচল করার উদ্যোগ নেন।

১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১—মোট তিনবার তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তাঁর সরকার সন্ত্রাস দমনে র‍্যাব গঠন এবং টেলিযোগাযোগ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
​তবে তাঁর জীবনের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। সেই সময় তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

পরবর্তীতে ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে উচ্ছেদ করা হয়, যা ছিল তাঁর জন্য চরম মানসিক আঘাত। ২০১৫ সালে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকাকালেই তিনি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ পান। ছেলের কফিনের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি ছিলেন অবিচল।


​২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় কারাগারে এবং পরবর্তীতে ফিরোজার বাসায় একপ্রকার বন্দিজীবন কাটান তিনি। লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নির্বাহী আদেশে পূর্ণ মুক্তি পান।

উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশেও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন অনন্তের পথে।


​বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি নাম নয়, তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক মহলসহ সর্বস্তরের জনগণ।

দল-মত নির্বিশেষে মানুষ আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে তাঁর অবদান। আগামী দিনের বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিয়ে যখনই আলোচনা হবে, তখনই অবধারিতভাবে উঠে আসবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *