সর্বশেষ
মার্চ ৫, ২০২৬

ব্যাংক খাতে মন্দঋণের সঙ্কট: ৫ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার ঝুঁকি

Spread the love

মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই এখন মন্দঋণে পরিণত হয়েছে, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই মন্দমানের ঋণ অর্থাৎ যেসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। গত এক বছরে এই মন্দঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মন্দঋণের কারণে ব্যাংক খাতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা গত ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জাল জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজশের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে বের করে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই বা ঋণগ্রহীতাদের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি। ফলে এসব অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো সেগুলোকে মন্দঋণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। এতে ব্যাংক খাতে মন্দঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মন্দঋণ বাড়লে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়।

কারণ নিয়ম অনুযায়ী এসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়, যা সরাসরি ব্যাংকের মুনাফা কমিয়ে দেয় এবং আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে বিপুল পরিমাণ মন্দঋণের উপস্থিতি ব্যাংক খাতের গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দেয়।ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণের তিনটি ধাপ রয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত ঋণকে নিম্নমান, ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সন্দেহজনক এবং ১২ মাসের বেশি সময় খেলাপি থাকলে সেটিকে মন্দঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এ তিনটি স্তরের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দঋণের বিপরীতে শতভাগ।খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত জামানতের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, ইচ্ছাকৃত খেলাপি প্রবণতা এবং দীর্ঘদিনের মামলাজট এসব কারণে অনেক ঋণ দ্রুত মন্দমানে পরিণত হচ্ছে। আবার বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুবিধা নিয়েও ঋণ পরিশোধ না করায় সেগুলো আবার খেলাপি হয়ে মন্দঋণের কাতারে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা মন্দমানের, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, মন্দঋণ হলো খেলাপি ঋণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ। যেসব ঋণ বাস্তবে আর আদায়ের সম্ভাবনা নেই, সেগুলোই এই শ্রেণিতে পড়ে।

এসব ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ব্যাংক সেই প্রভিশন রাখতে পারছে না, যার ফলে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের আয় থেকেই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে বিপুল মন্দঋণ থাকলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে পরোক্ষভাবে আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি বেশি হলে ব্যাংকের মূলধন চাপে পড়ে, মুনাফা কমে যায় এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা হ্রাস পায়।

এতে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই প্রকৃত সংস্কার, কঠোর নজরদারি এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া ব্যাংক খাতের মন্দঋণ সংকট কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *