মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
দেশের বস্ত্র খাতে বন্ড সুবিধার ব্যাপক অপব্যবহার এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রপ্তানিকারকদের সুবিধার্থে চালু হওয়া এই ব্যবস্থার আওতায় ভুয়া প্রাপ্যতা দেখিয়ে অতিরিক্ত সুতা ও কাপড় আমদানি করে তা খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশীয় প্রাইমারি বস্ত্র শিল্প মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।উদ্যোক্তারা জানান, বন্ড সুবিধার মাধ্যমে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ থাকলেও সেটির অপব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিম্ন কাউন্টের বদলে উচ্চ কাউন্টের সুতা আমদানি করছে। এমনকি যেসব মিলের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই, সেসব কারখানার নামেও সুতা ও কাপড় এনে খোলা বাজারে ছাড়ছে একটি চক্র।
এতে দেশীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত সুতা ও কাপড় বিক্রি না হয়ে গুদামেই পড়ে থাকছে।নারায়ণগঞ্জ সদর, আড়াইহাজার, মাধবদী, বাবুরহাট, নরসিংদী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে অবৈধভাবে আমদানিকৃত সুতা ও কাপড় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনাশুল্কে আমদানির কারণে এসব পণ্যের দাম কম হওয়ায় বাজারে দেশীয় পণ্য টিকে থাকতে পারছে না। স্থানীয় ডিলারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য সাধারণত ঢাকার আশপাশের কিছু কারখানা থেকে সরবরাহ করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই ব্যবসা পরিচালিত হয়—যা অনেকের কাছেই ওপেন সিক্রেট।
উদ্যোক্তারা বলছেন, বন্ড লিকেজ বন্ধ না হলে দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট উপখাতের বহু কারখানা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাত থেকে, যার বড় অংশই টেক্সটাইল শিল্পনির্ভর। স্থানীয় মিলগুলো ওভেন ও নিটওয়্যার খাতের সুতার চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের কাপড়ের চাহিদারও বড় অংশ জোগান দেয়। এই খাত দুর্বল হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়মের কথা জানানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভিযান খুব সীমিত পর্যায়ে থাকায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ফলে উদ্যোক্তারা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এনবিআরের বন্ড কমিশনারেটের সদস্যদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন, এলসিতে উল্লিখিত পণ্যের সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের মান স্বয়ংক্রিয় মেশিনে যাচাই, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউস আকস্মিক পরিদর্শন এবং কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিরেক্টরেটকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া। উদ্যোক্তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের প্রাইমারি বস্ত্র খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

