সম্পাদকীয়, অপু আবুল হাসান,(নিউ ইয়ার ২০২৬ স্পেশাল):
নিউইয়র্কের ম্যানহাটন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস। প্রখ্যাত নিলাম সংস্থা সথবিস-এর একটি গোপন নিলাম কক্ষ। বুলেটপ্রুফ কাঁচের ভেতর চামড়ায় মোড়ানো একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। নিলামে উপস্থিত বাঘা বাঘা ধনকুবেরদের সতর্ক করে দেওয়া হলো, এই বই শুধু দেখাই যাবে, স্পর্শ করা বারণ। বইটির নাম বা পরিচয় গোপন রাখা হলেও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল, এটিই সেই হাজার বছরের পুরোনো জাদুর কিতাব—’পিকাট্রিক্স’।
শুরু হলো নিলাম। ২৩ লাখ ডলার থেকে শুরু হয়ে মুহূর্তেই দাম চড়ল আকাশে। শেষ পর্যন্ত ৪৩ লাখ ডলারে বইটি কিনে নিলেন সিলিকন ভ্যালির এক নামকরা বিলিয়নিয়ার। ধারণা করা হয়, এই বইয়ের গোপন মন্ত্র দিয়ে তিনি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বইটি হাতে পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই কোটিপতি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হন এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে দুবাই পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
কী আছে এই রহস্যময় বইয়ে?
‘পিকাট্রিক্স’ মূলত একাদশ শতাব্দীর একটি আরবি গ্রন্থ ‘গায়াতুল হাকিম’-এর ল্যাটিন অনুবাদ। ৯৫০-এর দশকে স্পেনের কর্ডোবায় বসে বইটি লিখেছিলেন আবু আব্দুল্লাহ মাসলামা ইবনে কাসিম আল-কুরতুবি। বাহ্যিকভাবে তিনি ছিলেন একজন গণিতবিদ ও হাদিস বিশারদ, কিন্তু গোপনে চর্চা করতেন ব্ল্যাক ম্যাজিক বা কালো জাদু।
৪০০ পৃষ্ঠার এই বইয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ব্যবহার করে জাদুটোনা, তুকতাক এবং জিন বশীকরণের ভয়ঙ্কর সব পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। বইটিতে এমন সব ঘৃণ্য উপাচারের কথা লেখা হয়েছে যা শুনলে গা শিউরে উঠবে। যেমন—শনি গ্রহের অশুভ শক্তিকে কাজে লাগাতে মানুষের রক্ত, মগজ এবং বিভিন্ন প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে জাদুর মিশ্রণ তৈরির নির্দেশ। লেখকের দাবি ছিল, এই জাদুর মাধ্যমে মহাজাগতিক শক্তিকে নিজের দাস বানানো সম্ভব।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আধুনিক ট্র্যাজেডি
বইটি রচনার পর থেকেই এটি বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ ছিল। ১২৫৬ সালে স্পেনের রাজা আলফোনসো দ্য টেনথ বইটিকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদের নির্দেশ দেন। এরপর ইউরোপের গুপ্ত সংগঠনগুলোর হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে এই কিতাব। ধারণা করা হয়, আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট বা শেয়ার বাজারের অনেক জটিল অ্যালগরিদম এই প্রাচীন জাদুর দর্শনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আধুনিক যুগের ‘অ্যালগোরিদমিক আলকেমি’ যেন সেই আদিম জাদুরই ডিজিটাল সংস্করণ।
যেই বিলিয়নিয়ার বইটি কিনেছিলেন, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন নক্ষত্র নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ভাগ্য বদলে ফেলবেন। কিন্তু তার শেষ টুইট ছিল অনুশোচনায় ভরা। তিনি লিখেছিলেন, আমি ভেবেছিলাম এই বই দিয়ে আমি ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করব। কিন্তু আমি জানতাম না যে ভাগ্য কোনো সৃষ্টির হাতে নয়, বরং স্রষ্টার হাতে।
বর্তমানে বইটির আসল কপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সংরক্ষিত অংশে রয়েছে। গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই ধরনের বই পাঠ বা চর্চা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের উচিত ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোনো জাদুর বইয়ের ওপর নির্ভর না করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
সূত্র: ইমতিনান আহমাদ (Imtinan Ahmad) এর ভিডিও লেকচার অবলম্বনে।

