কলামে,অপু আবুল হাসান/সম্পাদকীয়:
হাদীর প্রস্থান ও অসমাপ্ত সংগ্রাম:আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই ও একজন ছাত্রনেতার আত্মত্যাগকলাম :অপু আবুল হাসান,অ্যাক্টিভিস্ট বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল থেকে বৃহস্পতিবার যে দুঃসংবাদটি এসেছে, তা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি যেন বারুদভর্তি এক সলতেতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্রনায়ক এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু বাংলাদেশকে আবারও এক চরম সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে।
মাত্র ৩২ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা, যিনি আগামী নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তার এই অকাল প্রস্থান জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানলেন এই বিপ্লবী।
কিন্তু তার এই মৃত্যু রেখে গেল অনেকগুলো জ্বলন্ত প্রশ্ন এবং একটি উত্তপ্ত রাজপথ।নিরাপত্তার ব্যর্থতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নপ্রথম যে প্রশ্নটি আজ প্রতিটি নাগরিকের মনে—রাজধানীর বুকে এমন একজন হাই-প্রোফাইল তরুণ নেতার নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হলো কেন?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই মৃত্যুকে জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কেবল শোক প্রকাশই কি যথেষ্ট? সিসিটিভি ফুটেজে আততায়ীদের দেখা যাওয়ার পরেও, এবং পুলিশের পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণা করার পরেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন?
জনতা আজ স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের দিকে আঙুল তুলছে, মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করছে। এই ক্ষোভ অমূলক নয়। একটি বিপ্লব-পরবর্তী দেশে বিপ্লবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারাটা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই শামিল।ভূ-রাজনীতি এবং ভারত-বিদ্বেষের নতুন মাত্রাহাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জনমনে যে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জনমনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, হত্যাকারীরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে যে অবিশ্বাস দানা বেঁধেছিল, এই হত্যাকাণ্ড তাতে ঘৃতাহুতির কাজ করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি-র মতো দলগুলো স্পষ্ট ভাষায় বলছে, ভারত থেকে খুনিদের ফেরত না আনা পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। এটি আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্নায়ুচাপ তৈরি করতে পারে।গণমাধ্যমের ওপর আঘাত: গণতন্ত্রের জন্য হুমকিহাদীর মৃত্যুর পর আবেগের বিস্ফোরণ স্বাভাবিক, কিন্তু সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করার যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু তার জবাব সহিংসতা দিয়ে হতে পারে না। বিপ্লবের মূল মন্ত্রই ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র।
আজ যদি ‘মব জাস্টিস’-এর নামে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়, তবে তা ফ্যাসিবাদেরই আরেক রূপান্তর মাত্র।করণীয় ও শেষ কথাশরীফ ওসমান হাদীর রক্ত যেন বৃথা না যায়। তবে মনে রাখতে হবে, অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য কখনোই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। সরকারের এখন প্রধান দায়িত্ব হলো—যেকোনো মূল্যে, প্রয়োজনে ইন্টারপোল বা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশ আজ এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং জনগণের ধৈর্য। আবেগের আগুনে রাষ্ট্র যেন পুড়ে না যায়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। হাদীর আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন দেশে সত্যিকারের আইনের শাসন ও আধিপত্যবাদমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

