কাজী সাজিদ আহমেদ,স্টাফ রিপোর্টার:
২০২৫ সালের ২১ ও ২২ নভেম্বর কেন্দ্রীয় বাংলাদেশে অনুভূত হওয়া একাধিক ভূকম্পনের সিরিজ, বিশেষত ২১ তারিখ সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে আঘাত হানা ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি, ঢাকা মহানগরীর কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতির প্রশ্নে এক চরম সতর্কতা জারি করেছে ।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এটিকে গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; বরং এটি ছিল ঢাকা মহানগরীর সুদূরপ্রসারী ও পদ্ধতিগত দুর্বলতার এক নির্মম চিত্র।ক. ঘটনার তাৎক্ষণিক চিত্র ও প্রারম্ভিক ক্ষয়ক্ষতি৫.৭ মাত্রার এই ভূকম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা সংলগ্ন নরসিংদী জেলার মাধবদী/ঘোড়াশাল এলাকা এবং এর গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার ।
পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টাজুড়ে এই ঝাঁকুনির জের চলে। ২২ নভেম্বর, শনিবার, সকালে ৩.৩ মাত্রার মৃদু কম্পন এবং সন্ধ্যায় ৪.৩ মাত্রার (যা ঢাকার বাড্ডা এলাকায় উৎপত্তি লাভ করে) স্পষ্ট কম্পন অনুভূত হয় ।
ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল রাজধানীর এত কাছে থাকা এবং এর গভীরতা মাত্র ১০ কিলোমিটার (অগভীর ভূমিকম্প বা Shallow Quake) হওয়ায়, সিসমিক তরঙ্গ ভূমিতে কম দূরত্ব অতিক্রম করে কম্পনের তীব্রতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে ।এই মাঝারি মাত্রার কম্পনের ফলাফল ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে গুরুতর।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে ৫ জন এবং ঢাকায় ৪ জনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৬১ জন আহত হয়েছেন । এই হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ঢাকার নগর কাঠামোর চরম ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই প্রাণহানির প্রধান কারণ সরাসরি বড় ভবন ধস নয়, বরং দুর্বল অ-কাঠামোগত উপাদানের (Non-structural elements) পতন। উদাহরণস্বরূপ, পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকায় একটি ভবনের রেলিং ধসে তিনজন পথচারী নিহত হন। এছাড়া ছাদ ও দেয়াল ধসেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ।খ. সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ এবং মহাবিপর্যয়ের প্রশ্নএকজন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন, ভূমিকম্পের মাত্রা বিবেচনায় এই হতাহতের সংখ্যা “কিছুটা বেশি” হয়েছে ।
এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটি নির্দেশ করে যে, কাঠামোগত দুর্বলতা শুধু কলাম-বিম বা ফাউন্ডেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ফিনিশিং কাজ, রেলিং, পলেস্তারা বা ফলস সিলিংয়ের মতো অ-কাঠামোগত উপাদানগুলির নিম্নমানও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
মাঝারি মাত্রার কম্পনে যদি মানুষ ভবন অক্ষত থাকা সত্ত্বেও এসব উপাদানের পতনে মারা যান, তবে এর অর্থ হলো বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC)-এর মতো কঠোর বিধিনিষেধগুলি কেবলমাত্র কাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলেই হবে না, বরং অ-কাঠামোগত নিরাপত্তার মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা আবশ্যক।
যদি এই ভূমিকম্পের মাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৯ বা ৭.০+ এ পৌঁছাতো, যা মধূপুর বা দাওকি ফল্ট লাইনে আঘাত হানার ক্ষেত্রে চরম বাস্তব হতে পারত, তবে ঢাকা মহানগরীর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত মহাবিপর্যয়ে রূপ নিত ।
৫.৭ মাত্রার এই ঘটনা ছিল সেই অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয়ের একটি ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র।সারণী ১: সম্প্রতি অনুভূত ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও ক্ষয়ক্ষতি| বৈশিষ্ট্য (Feature) | তথ্য (Data) | তাৎপর্য (Significance) ||—|—|—|| মাত্রা (Magnitude) | ৫.৭ (রিখটার স্কেল) | ঢাকার নিকটস্থ অঞ্চলে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন || উৎপত্তিস্থল (Epicenter) | নরসিংদীর মাধবদী/ঘোড়াশাল (ঢাকা সংলগ্ন) | রাজধানীর কেন্দ্র থেকে মাত্র ১০-১৪ কিলোমিটার দূরে ||
গভীরতা (Depth) | মাত্র ১০ কিলোমিটার (অগভীর কম্পন) | অগভীর ভূমিকম্পের তীব্রতা ভূমিতে বহুগুণে বৃদ্ধি পায় || হতাহত (Casualties) | নিহত: ১০ জন, আহত: ৪৬১ জন | স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্রা বিবেচনায় হতাহতের সংখ্যা “কিছুটা বেশি” হয়েছে || প্রাণহানির প্রধান কারণ | দুর্বল অ-কাঠামোগত উপাদান (রেলিং, ছাদ/দেয়াল ধস) | নগর কাঠামোর দুর্বলতা প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বেশি দায়ী |II. ভৌগোলিক নিয়তি ও ঢাকার ভূতাত্ত্বিক বিপদঢাকা মহানগরী পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত, যার প্রধান কারণ টেকটোনিক চাপ এবং দুর্বল ভূমিগত গঠন। শহরটি একটি ভূতাত্ত্বিক সময় বোমার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা যেকোনো মুহূর্তে সক্রিয় হতে পারে।
ক. টেকটোনিক চাপ ও সক্রিয় ফল্ট লাইনবাংলাদেশ, বিশেষত ঢাকা অঞ্চলটি, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সীমানার কাছাকাছি অবস্থিত । ঢাকা দাওকি ফল্ট, ত্রিপুরা ফল্ট এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মধূপুর ব্লাইন্ড ফল্টের প্রভাববলয়ে রয়েছে । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অঞ্চলে টেকটোনিক চাপ দীর্ঘকাল ধরে জমা হচ্ছিল, এবং ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে “বড় ভূমিকম্প আসার আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়—এটি তার আগাম বার্তা” । যদিও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো অঞ্চলগুলিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোনে রাখা হয়েছে, তবে ঢাকা, যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৩০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ বাস করে, তাকে বিশ্বব্যাপী ২০টি সবচেয়ে ভূমিকম্প-সংবেদনশীল শহরের মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।খ. ভূমিগত দুর্বলতা: বিবর্ধন (Site Amplification) ও তরলীকরণ (Liquefaction)ঢাকার ঝুঁকি কেবল ফল্ট লাইনের নৈকট্য থেকে আসে না, বরং এর ভূমিগত দুর্বলতা দ্বারা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
নগরীর প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা নদীর তীরবর্তী নরম কাদামাটি ও বালুমাটির ওপর গড়ে উঠেছে, যা মোহাম্মদপুর, উত্তরা, পূর্বাচল এবং বাড্ডার মতো ক্রমবর্ধমান এলাকাগুলিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে ।এই নরম মাটির বৈশিষ্ট্য দুটি গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করে:১. মাটি বিবর্ধন (Site Amplification): নরম মাটিতে ভূমিকম্পের সিসমিক তরঙ্গগুলি শক্তি সঞ্চয় করে এবং কম্পনের তীব্রতাকে স্থানীয়ভাবে বাড়িয়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, লালবাগ ও কোতোয়ালির মতো পুরোনো এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে বিবর্ধন ফ্যাক্টর ২.৪ বা তার বেশি হতে পারে । আগারগাঁও, খিলগাঁও এবং সবুজবাগে এই ফ্যাক্টর ২.২ থেকে ২.৪ এর মধ্যে থাকে ।
এই উচ্চ বিবর্ধন ফ্যাক্টর নিশ্চিত করে যে মাঝারি কম্পনও অত্যন্ত দুর্বল বা ঘিঞ্জি কাঠামোর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।২. তরলীকরণ (Liquefaction): বিশেষ করে উত্তরা, তুরাগ, পল্লবী, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, মোহাম্মদপুর এবং কামরাঙ্গীর চরের মতো এলাকায় বালুকাময় মাটি রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় এই মাটি তরলের মতো আচরণ করতে পারে, যার ফলে ভবনগুলি গভীরে দেবে যেতে বা হেলে যেতে পারে ।এই দুটি ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি একত্রে ঢাকার বিপদকে দ্বিস্তরীয় গুণকের মাধ্যমে বাড়িয়ে তোলে।
নরম মাটির কারণে একদিকে কম্পনের তীব্রতা বাড়ে (বিবর্ধন), অন্যদিকে কাঠামোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় (তরলীকরণ)। সবচেয়ে বিপজ্জনক তথ্য হলো, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে বর্ষা মৌসুমে হলসিন বন্যাভূমি (Zones 2 ও 3)-তে তরলীকরণের সম্ভাবনা ১০০% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে ।সারণী ২: ৭.০ Mw
ভূমিকম্পে ঢাকার বিভিন্ন জোনে তরলীকরণ (Liquefaction) এর সম্ভাবনা| ভূতাত্ত্বিক জোন (Geological Zone) | মাটির ধরন (Soil Type) | শুকনো মৌসুমে সম্ভাবনা (Dry Season Probability) | বর্ষা মৌসুমে সম্ভাবনা (Wet Season Probability) ||—|—|—|—|| জোন ১ (মধূপুর সোপান) | তুলনামূলক শক্ত মাটি | ৬৮% | ৯০% || জোন ২ (খাল ও কৃত্রিম ভরাট) | নরম পলি, কাদামাটি | ৮০% | ১০০% || জোন ৩ (হোলসিন বন্যাভূমি) | বালুকাময় ও কাদামাটি | ৮৮% | ১০০% || উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা (উদাহরণ) | উত্তরা, তুরাগ, পল্লবী, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, মোহাম্মদপুর | – | – |গ. বিপর্যয়ের ভয়াবহ পূর্বাভাসরাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি মধূপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে ঢাকার মোট ভবনের ৪১.২৮% থেকে ৬৪.৮৩% পর্যন্ত (যা প্রায় ১৩.৯১ লাখ ভবন) সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে বা মারাত্মক কাঠামোগত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে । ৭.৫ Mw ভূমিকম্প এবং বর্ষা মৌসুমে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষ (১ কোটি ৩৯ লাখের বেশি) তরলীকরণ ঝুঁকির মধ্যে থাকবে । এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে ৫.৭ মাত্রার কম্পনটি যদি শুধু একটি ‘ট্রেইলার’ হয়, তবে আসন্ন মহাবিপর্যয়ের ফল হবে কল্পনারও অতীত।III. কাঠামোগত অবক্ষয় ও BNBC প্রয়োগের ব্যর্থতাকাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশে জাতীয় আইন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC-2020) থাকা সত্ত্বেও, এর বাস্তব প্রয়োগে চরম গাফিলতি লক্ষ্য করা যায়, যা নগরীর ভঙ্গুরতাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে। এই কোডের উদ্দেশ্য হলো নির্মাণ, নকশা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদণ্ড স্থাপন করা, যাতে জীবন, স্বাস্থ্য ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুরক্ষিত থাকে ।ক. BNBC প্রয়োগের চ্যালেঞ্জ এবং ফাঁকজাতিসংঘের সংস্থা ইউএন-হ্যাবিট্যাট (২০২২) এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ঢাকার ৬০% এরও বেশি ভবন BNBC মানদণ্ড সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করে না, যা লাখ লাখ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে । এই ব্যাপক অমান্যতার পেছনে বেশ কিছু পদ্ধতিগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে:১. দুর্বল প্রশাসনিক তদারকি: রাজউক এবং অন্যান্য আইনি সংস্থাগুলির পর্যাপ্ত সংখ্যক পরিদর্শক নেই, যার ফলে প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্প তদারকি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে । এই সীমিত জনবল আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে।
২. কমপ্লায়েন্সের আর্থিক বাধা: BNBC মানদণ্ড মেনে চলতে উচ্চমানের উপকরণ, কাঠামোগত নিরীক্ষা এবং উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, যা নির্মাণ ব্যয় ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয় । এই অতিরিক্ত খরচ এড়াতে কিছু ডেভেলপার কোড অমান্য করতে উৎসাহিত হয়।৩. অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রভাব: ঢাকার প্রায় ৪০% আবাসন নির্মাণ অনানুষ্ঠানিক খাত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । এই খাতের নির্মাতারা প্রায়শই BNBC 2020 এর সর্বশেষ আপডেট এবং নির্দেশিকা সম্পর্কে অসচেতন থাকে বা সচেতনভাবে তা এড়িয়ে চলে।৪. দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: ডেভেলপারদের ৫৮% অনানুষ্ঠানিক ফি প্রদান করেন বলে রিপোর্ট করা হয়েছে । এই দুর্নীতি প্রশাসনিক বিলম্বকে বাড়িয়ে দেয় এবং দ্রুত ও অবৈধ নির্মাণকে উৎসাহিত করে।এই ব্যর্থতা একটি অর্থনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুসারে, বাংলাদেশে নিরাপদ বিল্ডিং কোড প্রয়োগ করলে দুর্যোগ-সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করে বছরে $১ বিলিয়ন সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারত । যখন BNBC কমপ্লায়েন্স নির্মাণ খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং একই সময়ে দুর্বল তদারকি থাকে, তখন বেসরকারি খাতের কাছে BNBC অমান্য করা আর্থিকভাবে ‘লাভজনক’ হয়ে ওঠে। এই আর্থিক প্রণোদনা এবং দুর্বল তদারকি একটি মারাত্মক দুষ্টচক্র তৈরি করে, যেখানে এই মুহূর্তে ‘সাশ্রয়’ করা অর্থ ভবিষ্যতে অনিবার্য বিপর্যয়ের জন্য $১ বিলিয়ন অতিরিক্ত ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
খ. আধুনিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ত্রুটিBNBC অমান্য করার ফলে আধুনিক ভবনেও নানা কাঠামোগত ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে, পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত নিচতলাগুলি (Soft Ground Floors), যেখানে পর্যাপ্ত পার্শ্বীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না, ভূমিকম্পের সময় ভবনের সবচেয়ে ভঙ্গুর বিন্দুতে পরিণত হয় ।
নির্মাণ সামগ্রী, যেমন কংক্রিটের গুণগত মানের অসঙ্গতিও ভবনগুলিকে আরও দুর্বল করে তোলে, যা বড় কম্পনের মোকাবিলায় কাঠামোর শক্তি হ্রাস করে ।উপরন্তু, যদিও BNBC 2020 এর উদ্দেশ্য অত্যন্ত উন্নত, এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাগুলির জন্য ১৯৫২ সালের পুরাতন বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্টের শরণাপন্ন হতে হয় ।
একটি পুরনো আইনি ভিত্তির ওপর নতুন, জটিল কোড চাপিয়ে দেওয়া আইনি প্রক্রিয়াকে ধীর এবং আমলাতান্ত্রিকভাবে জটিল করে তোলে।IV. প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা: ৪২টি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ সরকারি ভবনের মামলাঢাকার স্থিতিস্থাপকতার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি এসেছে প্রশাসনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তর থেকে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্তৃক চিহ্নিত ৪২টি ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ সরকারি ভবনের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা সামগ্রিক নগর স্থিতিস্থাপকতার প্রতি চরম অবহেলার প্রতীক।ক. আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের অনুসন্ধানরাজউক সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে মোট ৩,২৫২টি সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনের ওপর ভূমিকম্প সহনশীলতা জরিপ চালায় ।
জরিপের মাধ্যমে ৫৭৯টি ভবনের প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (PEA) রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এই রিপোর্টে ৪২টি ভবনকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয় এবং ১৮৭টি ভবনকে রেট্রোফিটিং করার পরামর্শ দেওয়া হয় ।খ. সমালোচনামূলক স্থাপনা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় ও সমালোচনামূলক অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ১৭ তলা ‘ডি’ ব্লক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনসহ ৪টি ভবন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হল এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন ৩০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ।
এই ভবনগুলির ঝুঁকি নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা চরমভাবে প্রকট। রাজউক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে তিন মাসের মধ্যে ভবনগুলি না ভাঙলে নিজ উদ্যোগে ভাঙার এবং খরচ আদায়ের হুমকি দিলেও , সাত মাস পরও (কম্পনের পূর্বে) এসব নির্দেশ কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়নি ।বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ রাজউকের তদন্ত সঠিক হয়নি দাবি করে রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ।
অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস করছেন, যেখানে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে । যদিও মাউশি পরে ৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাত দিনের মধ্যে খালি ও সিলগালা করার নির্দেশ দিয়েছে , কিন্তু এই পদক্ষেপের বিলম্ব সামগ্রিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।সারণী ৩: রাজউকের ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ সরকারি ভবন: প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার চিত্র| প্রতিষ্ঠান/ক্ষেত্র (Institution/Sector) | অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা | গুরুত্বপূর্ণ ভবনের উদাহরণ |
বর্তমান পরিস্থিতি (পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে) ||—|—|—|—|| শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (IED) | ৩০ (মাউশির অধীনে ৪২টির অংশ) | বাড্ডার আলাতুন্নেছা উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ | খালি বা ভাঙার নির্দেশ কঠোরভাবে কার্যকর হয়নি || বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) | ৩টি | ১৭ তলা ‘ডি’ ব্লক | কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে || জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) | ৪টি | কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনসহ | চরম ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস করছেন || জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) | ৩টি | মীর মশাররফ হোসেন হল | – || মোট চিহ্নিত ভবন | ৪২টি | – | প্রশাসনিক অনমনীয়তার শিকার |
গ. ‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ব্যর্থতার ঝুঁকিএই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার গভীর তাৎপর্য রয়েছে। বিএসএমএমইউ-এর মতো হাসপাতাল এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি ভূমিকম্প পরবর্তী সাড়াদানের জন্য সমালোচনামূলক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত। যদি ভূমিকম্পের সময় বিএসএমএমইউ-এর ‘ডি’ ব্লক ধসে পড়ে, তবে শুধু এর রোগী ও কর্মীরাই মারা যাবেন না, বরং আহতদের চিকিৎসার জন্য জরুরি সেবাদানের মূল কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে যাবে ।
এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে অগ্রাধিকারের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।যখন দেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ স্বয়ং নিরাপত্তা নির্দেশ অমান্য করে, তখন তা সাধারণ ভবন মালিক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে BNBC মানদণ্ড অনুসরণে একটি নেতিবাচক নজির স্থাপন করে । আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও , ৪২টি ভবন ভাঙতে প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্ক ও বিলম্ব প্রমাণ করে যে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা অসম্ভব।
V. অনিবার্য সমাধান: রেট্রোফিটিং আইন ও আন্তর্জাতিক মডেলযেহেতু Dhaka-এর লক্ষ লক্ষ পুরোনো এবং কোড অমান্যকারী ভবন ভেঙে ফেলা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব, তাই বিদ্যমান কাঠামোগত নিরাপত্তা বাড়াতে রেট্রোফিটিং (মজবুতিকরণ) একমাত্র কার্যকর ও অনিবার্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত।ক. রেট্রোফিটিংয়ের অপরিহার্যতারেট্রোফিটিং হলো পুরোনো ভবনগুলিতে নতুন প্রযুক্তি ও শক্তিবর্ধক উপাদান যুক্ত করে ভূমিকম্পের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা । এর মাধ্যমে শুধু ভবনের বাসিন্দাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় না, বরং পুরোনো কাঠামো এবং ঐতিহ্যগত মূল্যের ভবনগুলিকেও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় ।
রেট্রোফিটিং এর প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে কলামের কংক্রিট জ্যাকেটিং বা স্টিল প্রোফাইল জ্যাকেটিং, শিয়ার ওয়াল সংযোজন (বিশেষ করে নন-ডাকটাইল রিনফোর্স কনক্রিট স্ট্রাকচারে), এবং ফাইবার রেইনফোর্সড পলিমার (FRP) র্যাপিং এর মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা ।খ. আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত: তুরস্কের মডেলভূমিকম্প ঝুঁকির মোকাবিলায় তুরস্কের অভিজ্ঞতা ঢাকার জন্য বিশেষ শিক্ষণীয়। ১৯৯৯ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর তুরস্ক সরকার একটি ব্যাপক নগর রূপান্তর পরিকল্পনা (Urban Transformation Plan) প্রণয়ন করে । ২০০০ সালের আগে নির্মিত প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন আবাসিক ভবনের কাঠামোগত মজবুতিকরণের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়, যার জন্য আনুমানিক $৪৬৫ বিলিয়ন খরচ হতে পারে ।
এই বিশাল ব্যয় সত্ত্বেও, তুরস্ক সরকার এবং বিশ্বব্যাংক ইস্তাম্বুল সিসমিক মিটিগেশন অ্যান্ড ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস প্রজেক্ট (ISMEP)-এর মাধ্যমে একটি সামগ্রিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি চালু করে, যা শুধুমাত্র পুনর্গঠনের পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগকে প্রাধান্য দেয় ।এই মডেল স্পষ্টভাবে দেখায় যে, রেট্রোফিটিং না করার চূড়ান্ত মানবিক ও আর্থিক খরচ, এই মুহূর্তে মজবুতিকরণের জন্য প্রণোদনা বা বিনিয়োগের খরচের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
গ. বাংলাদেশে রেট্রোফিটিং নিশ্চিত করার কৌশলঢাকার ঝুঁকি মোকাবিলায় রেট্রোফিটিং বাধ্যতামূলক করার জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগুলি গ্রহণ করা অপরিহার্য:১. বাধ্যতামূলক কাঠামোগত মূল্যায়ন: ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে সমস্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলির জন্য পর্যায়ক্রমিক কাঠামোগত মূল্যায়ন (Seismic Assessment) এবং সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে ।২. আর্থিক প্রণোদনা প্রদান: বেসরকারি সম্পত্তি মালিকদের রেট্রোফিটিংয়ে উৎসাহিত করতে হবে। তুরস্কের মতো আর্থিক সমর্থন প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি, যার মধ্যে কর ছাড় বা স্বল্প সুদের ঋণ (Low-interest loans) অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে ।৩. প্রযুক্তি গ্রহণ: ফাইবার রেইনফোর্সড পলিমার (FRP) বা ফাইবার রেইনফোর্সড সিমেন্ট ম্যাট্রিক্স (FRCM)-এর মতো উন্নত শক্তিবর্ধক প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা, যা রেট্রোফিটিংয়ের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং খরচ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে ।
VI. দুর্যোগ সাড়াদান ও জীবন রক্ষাকারী নগর পরিকল্পনাঢাকা মহানগরী শুধু কাঠামোগতভাবে দুর্বল নয়, এর চরম জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগর বিন্যাস দুর্যোগ সাড়াদান সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর, যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৩০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ বাস করে ।ক. ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সাড়াদান চ্যালেঞ্জভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত বাসিন্দারা নিরাপদ উন্মুক্ত স্থানে (Open Spaces) যেতে না পেরে সরু গলি বা ছোট জায়গায় জড়ো হতে বাধ্য হন । নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই সরু গলিগুলি আফটারশকের সময় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে ।
সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্যোগের পরে পার্ক ও খোলা স্থানগুলি আশ্রয়, ত্রাণ ও তথ্য সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে অপরিহার্য ।ঢাকার ঘনবসতি এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বড় দুর্যোগে সরু লেনগুলি উদ্ধারকারী দলের প্রবেশকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেবে । এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে ভূমিকম্পের প্রথম ৭২ ঘণ্টা, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত, সেই সময়ে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ধার (Spontaneous Rescue) এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রস্তুতিই প্রধান ভরসা।খ. জীবন রক্ষাকারী নগর পরিকল্পনার উপাদাননগর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভূমিকম্প স্থিতিস্থাপকতাকে আনতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:১. উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ: বিদ্যমান উন্মুক্ত স্থানগুলিকে (Public Open Spaces – POS) দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করতে হবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের উচিত আবাসন ঘনত্ব পুনর্বন্টনের মাধ্যমে নিম্ন-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উৎসাহিত করা এবং সবুজ স্থানগুলিকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংহত করা ।২. জরুরি রুট পরিকল্পনা: একটি ‘ফেইল্ড সিটি মডেল’-এর ভয়াবহতা এড়াতে, যেখানে ভবন ধস এবং ধ্বংসাবশেষের কারণে জরুরি রুটগুলি অবরুদ্ধ হয়ে যাবে, সেখানে উদ্ধারকারী দলের জন্য স্পষ্ট এবং সংরক্ষিত রুট চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি।
৩. গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্গায়ন: অগ্নি নির্বাপক বিভাগ, হাসপাতাল, জরুরি যোগাযোগ কেন্দ্র (EOC) এবং অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলির কাঠামোগত মজবুতিকরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক ।৪. সমন্বিত সাড়াদান পরিকল্পনা: একটি সামগ্রিক সাড়াদান পরিকল্পনায় ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, আশ্রয় প্রদান এবং বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিবেশী অঞ্চলের সঙ্গে সমন্বয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশিকা থাকতে হবে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ভূমিকম্প মহড়া এবং স্বেচ্ছাসেবক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি ।VII. অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ও ঝুঁকি স্থানান্তরের কৌশলভূমিকম্পের ঝুঁকি কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকেও পঙ্গু করতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য জরুরি আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা অপরিহার্য।ক. RMG খাতের ওপর হুমকিতৈরি পোশাক শিল্প (RMG) বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০% এরও বেশি এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে ।
এই শিল্প দেশের সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত মানদণ্ড উন্নত হলেও, অধিকাংশ RMG কারখানায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি এখনো অগ্নিঝুঁকির ওপর নিবদ্ধ । ঢাকার কাছাকাছি অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চলগুলি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।খ. দুর্যোগের আর্থিক ঝুঁকি স্থানান্তরের দুর্বলতাবর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমার অবদান মাত্র ০.৫ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য । দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য এই দুর্বল বীমা খাত একটি বড় উদ্বেগের কারণ। ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, অথচ ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে পাওয়া গিয়েছিল মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার ।
সরকার প্রতি বছর পোস্ট-ডিজাস্টার হস্তক্ষেপের জন্য আনুমানিক $৮১০ মিলিয়ন খরচ করে । এই ঘাটতি প্রমাণ করে যে সরকার ঋণ নির্ভরতা এবং অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে।গ. ক্যাটাস্ট্রফি বন্ড (Catastrophe Bond) এর প্রয়োজনীয়তাএই আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্যাটাস্ট্রফি বন্ড (Cat Bond) এর মতো উদ্ভাবনী আর্থিক হাতিয়ারের ব্যবহার বাংলাদেশে জরুরি।
ক্যাট বন্ড হলো এক প্রকার বীমা-সম্পৃক্ত বিনিয়োগ বন্ড, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে দুর্যোগের জন্য আগাম অর্থায়ন নিশ্চিত করে ।Cat Bond-এর মূল সুবিধা হলো, একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগ ঘটলে বা ক্ষতি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করলে (যেমন প্যারামেট্রিক ট্রিগার ব্যবহার করে), এটি দ্রুত অর্থ সরবরাহ করতে পারে, যা ত্রাণ নির্ভরতা কমিয়ে জরুরি পুনর্বাসন নিশ্চিত করে ।
প্যারামেট্রিক ট্রিগার ব্যবহার করা হলে ক্ষতির হিসাব নিয়ে বিতর্ক কমবে এবং দ্রুত অর্থ ছাড় করা সম্ভব হবে ।এই বন্ড সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে শক্তিশালী ঝুঁকি মূল্যায়ন ডেটা ব্যবহার করতে হবে এবং বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক রি-ইন্স্যুরারের সহায়তায় গ্লোবাল মার্কেটে এটি ইস্যু করতে হবে ।
Green Sukuk-এর মতো শরিয়া-সম্মত বন্ডও ব্যবহার করা যেতে পারে, যা জলবায়ু অভিযোজন বিনিয়োগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং ESG বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে সহায়ক হবে । দ্রুত অর্থায়নের এই প্রক্রিয়া কেবল আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করে না, বরং দুর্যোগ-পরবর্তী জনরোষ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধেও সহায়ক হয়।
ঘ. সরকারি অবকাঠামো বীমাদুর্যোগের আর্থিক ঝুঁকি স্থানান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি অবকাঠামো বীমা করা। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) চুক্তিতে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ (Force Majeure) ইভেন্টের জন্য বীমা অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ।
সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (SBC)-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা সম্প্রসারিত করা জরুরি, যাতে তারা দুর্যোগের খরচ ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে ।VIII. উপসংহার: নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সময়ক্ষেপণের মূল্য২০২৫ সালের ২১ ও ২২ নভেম্বরের ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতা কেবল একটি সাময়িক ঝাঁকুনি ছিল না, এটি ছিল ঢাকার সিস্টেমেটিক ভঙ্গুরতার এক নির্মম চিত্র।
ভূতাত্ত্বিক চাপমুক্তির এই ক্ষুদ্র প্রকাশ প্রমাণ করে যে, কাঠামোগত দুর্বলতা, ভূমিগত সমস্যা (তরলীকরণ ও বিবর্ধন) এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা একত্রে ঢাকাকে একটি অমোঘ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—৪২টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি ভবনকে ঝুঁকি নিয়ে চালু রাখার সিদ্ধান্ত সমগ্র নগরীর স্থিতিস্থাপকতার প্রতি রাষ্ট্রের চরম অবহেলার প্রতীক।
বৃহত্তর মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে এখন জরুরি ভিত্তিতে কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য।বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সুপারিশমালাএই চরম ঝুঁকি প্রশমনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই।
নীতিনির্ধারকদের নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে অবিলম্বে মনোযোগ দেওয়া উচিত:১. অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ৪২টি ভবনের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করা: অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ৪২টি সরকারি ভবনের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করে ভেঙে ফেলার বা খালি করার নির্দেশ কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
এখানে বিএসএমএমইউ বা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমালোচনামূলক স্থাপনার ক্ষেত্রে বিতর্কের কোনো স্থান থাকতে পারে না।২. BNBC প্রয়োগে জিরো টলারেন্স নীতি: বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC-2020) এর প্রয়োগে কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এবং রাজউকের পরিদর্শন সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা। অ-কাঠামোগত নিরাপত্তার মানদণ্ড (যেমন রেলিং, ছাদ, দেয়াল) নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য।৩. বাধ্যতামূলক রেট্রোফিটিং আইন প্রবর্তন: তুরস্কের নগর রূপান্তর মডেল অনুসরণ করে সমস্ত পুরোনো ও দুর্বল ভবনের জন্য বাধ্যতামূলক সিসমিক অ্যাসেসমেন্ট এবং রেট্রোফিটিং আইন প্রবর্তন করা। ভবন মালিকদের রেট্রোফিটিং-এ উৎসাহিত করতে আর্থিক প্রণোদনা, যেমন কর ছাড় বা স্বল্প সুদের ঋণ, এবং উন্নত প্রযুক্তির (FRP) ব্যবহারকে উৎসাহিত করা।৪. জীবন রক্ষাকারী নগর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন: নগরীর উন্মুক্ত স্থানগুলিকে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করা। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জরুরি রুটগুলির অ্যাক্সেস নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ভূমিকম্প মহড়া চালু করার মাধ্যমে সামগ্রিক আরবান রেজিলিয়েন্স নিশ্চিত করা।
৫. উদ্ভাবনী ঝুঁকি স্থানান্তরের কৌশল গ্রহণ: সার্বভৌম ঝুঁকি স্থানান্তরের জন্য ক্যাটাস্ট্রফি বন্ডের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক হাতিয়ার (প্যারামেট্রিক ট্রিগারসহ) আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্যু করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপসহ সকল সরকারি অবকাঠামো বীমা করা বাধ্যতামূলক করা।সময় ফুরিয়ে আসছে। মাঝারি মাত্রার কম্পনে ১০ জনের মৃত্যু যদি নগর কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে না পারে, তবে ৭.০+ মাত্রার মহাবিপর্যয় দেশের অর্থনীতি এবং মানবিক পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফেরা অসম্ভব। এই মুহূর্তে কঠোর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ত্বরিত নীতিগত পদক্ষেপই পারে ঢাকাকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।

