মোঃ মাইউদুর রহমান লিও, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
মুন্সীগঞ্জ জেলার বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা তুল জান্নাত দায়িত্ব পালনকালে জেলার সার্বিক উন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার, সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বিদায়বার্তায় সেসব তুলে ধরে মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ফাতেমা তুল জান্নাত জানান, ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থির পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শহিদ পরিবার, ছাত্র-জনতা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে জেলার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন।জুলাই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের তালিকা প্রণয়ন, শহিদ পরিবারদের সাথে সাক্ষাৎ, দোয়া-মাহফিল আয়োজন, শহিদদের ছবি ও তথ্য সংবলিত “জুলাই স্মৃতি গ্যালারি” স্থাপন এবং পরে ‘চব্বিশের রক্তকথা’ নামে পুস্তিকা প্রকাশ ছিল সেই উদ্যোগের অংশ।
এছাড়া শহিদদের স্মরণে সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে “এক শহিদ এক বৃক্ষ” কর্মসূচির আওতায় ১৪টি সোনালু গাছ রোপণ করা হয়। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে শহিদদের কবর সংরক্ষণ ও বাঁধাই করা হয়।
জেলার পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে ছয় উপজেলার ৬২টি প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে ভ্রমণ গাইড ‘প্রত্নকথা’ প্রকাশ করা হয়। ভূমি সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সহজ ভাষায় ‘ভূমিকথা’ পুস্তিকা প্রকাশ ও জেলার প্রায় ১১ হাজার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করা হয়; এ নিয়ে জেলাব্যাপী কুইজ প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়।অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব ও বাহিনীপ্রধানদের উপস্থিতিতে ধারাবাহিক বৈঠক করে নানা প্রকল্প অনুমোদন বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মুন্সীগঞ্জ পুরাতন ফেরিঘাট–মুক্তারপুর–শ্রীনগর পর্যন্ত চার লেন প্রকল্পসিরাজদিখানে নার্সিং ইনস্টিটিউটকাটাখালী খাল খনন প্রকল্পপ্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণশিল্পকলা একাডেমি সংস্কারপৌরসভা ভবন নির্মাণআড়িয়ল বিল সংরক্ষণট্রমা সেন্টার সংস্কারবিভিন্ন খাল পুনঃখননচারটি নতুন পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ভবনদুই পৌরসভায় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণএছাড়া “সিরাজদিখানের পাতক্ষীর”–কে ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি মিলেছে।
লৌহজংয়ের কাঠের ঘর, মিরকাদিমের ধবল গরু ও আড়িয়ল বিলের মিষ্টি কুমড়ার জিআই নিবন্ধনের প্রক্রিয়াও চলছে।জেলায় ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের কমফোর্ট জোন ‘HerSpace’ স্থাপন করা হয়, যার ২১টি ইতোমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে।
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও বছরব্যাপী ছিল নানা আয়োজন—জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী ম্যাচ, জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ, কাবাডি, সাঁতারসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া “আমার চোখে জুলাই” কর্মসূচির আওতায় স্কুল–কলেজে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়।বিদায়বার্তায় তিনি বলেন, “আমার যোগ্যতা ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে মুন্সীগঞ্জবাসীর জন্য কাজ করেছি।
যদি আমার কোনো কাজ বা আচরণে কেউ মনঃক্ষুণ্ন হয়ে থাকেন—নিজগুণে ক্ষমা করবেন।”তিনি মুন্সীগঞ্জবাসীর ভালোবাসায় অভিভূত বলে উল্লেখ করেন এবং নিজের ও পরিবারের জন্য সকলের দোয়া প্রার্থনা করেন।পরিশেষে তিনি মুন্সীগঞ্জবাসীর প্রতি তাঁর “নিরন্তর শুভকামনা” জানিয়ে লেখেন—“মুন্সীগঞ্জ ভালো থাকুক সবসময়।”

