সাজলুর রহমান, মৌলভীবাজার থেকে:
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির আজকের বিশ্বজোড়া পরিচিতি এক আলোচনার বিষয়। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম যখন তার সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত, আমেরিকার শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো তার প্রতিটি ইভেন্ট কভার করতে ছুটে বেড়াচ্ছে, তখন তাকে নিয়ে অনেকেই নানা স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও অবদানের গল্প শেয়ার করছেন। কেউ তার রাজনীতিতে উঠে আসার পেছনে নিজেদের ভূমিকা দাবি করছেন, কেউ বা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন কমিউনিটি মিডিয়ায়।
তবে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার স্মৃতি এই কোলাহল থেকে একটু অন্যরকম।
সাংবাদিকরা মানুষের জীবনের পথচলা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। আমার চোখের সামনেই এক তরুণ রাজনীতিক আজ নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অথচ একসময় এই জোহরান মামদানিকে কেউ চিনতই না— তার নাম সংবাদে আসা তো দূরের কথা।

আমি বলছি সেই সময়ের কথা, যখন তিনি প্রথম নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির প্রার্থী হন। বিশ্ব তখন করোনা মহামারিতে বিধ্বস্ত; নিউইয়র্ক সিটি ছিল বিপর্যস্ত। মানুষের ঘরে খাবার ছিল না, ছিল না বাইরে বেরোনোর সাহস। মা বা স্ত্রীর জানাজায়ও অনেকে যেতে পারেননি।
করোনার দুঃসময়ে আলোর দিশা জাবেদ উদ্দিন
ঠিক সেই ভয়াবহ সময়ে এস্টোরিয়ায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এক সাহসী বাংলাদেশি, জাবেদ উদ্দিন। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের এই সন্তান নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছিলেন খাবার, মাস্ক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
সেই সময় এস্টোরিয়া থেকেই অ্যাসেম্বলির প্রার্থী ছিলেন জোহরান মামদানি। একদিন তিনি জানতে পারেন জাবেদ উদ্দিনের নাম। এরপর ফোন করে কথা বলেন এবং দেখা করেন তার সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের পরিচয়, এবং এক অসাধারণ সহযোগিতার গল্পের বুনন।
জাবেদ উদ্দিন তার প্রায় সব কোভিড সহায়তা প্রোগ্রামে জোহরান মামদানিকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানাতেন, এস্টোরিয়ার মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিতেন। আমি নিজ চোখে দেখেছি, সেই সহায়তা নিতে লম্বা লাইনে দাঁড়াতেন কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, হিস্পানিকসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।
মিডিয়া নির্ভরতা: টাইম টেলিভিশন
জাবেদ ভাইয়ের কাছ থেকেই আমি প্রথম জোহরান মামদানির নাম শুনি। তখন আমি টাইম টেলিভিশনের হেড অফ নিউজ হিসেবে কাজ করতাম এবং এস্টোরিয়া পার্কের কাছেই আমার বাস ছিল।
জাবেদ ভাই প্রায়ই অনুরোধ করতেন, “আহাদ ভাই, আমার প্রোগ্রামটা কভার করেন না?” যেহেতু আমি প্রোগ্রামের পথ দিয়েই অফিসে যেতাম, তাই প্রায়ই থেমে যেতাম, মোবাইলে কিছু ক্লিপ রেকর্ড করতাম, আর রাত ৮টার বুলেটিনে সেই নিউজটি প্রচার করতাম। অনেক সময় একই ধাচের প্রোগ্রাম হওয়ায় কভার করা হতো না। কিন্তু জাবেদ ভাই ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি ফোন করে বলতেন, “আহাদ ভাই, জোহরান আমাদের মুসলিম ছেলে, ভালো কাজ করছে, একটু হাইলাইট দিন।” তার মানবিক আবদার উপেক্ষা করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল।
অর্থাৎ, তখন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে জাবেদ উদ্দিন এবং জোহরান মামদানি, উভয়েরই মিডিয়া নির্ভরতা ছিল একটিই: টাইম টেলিভিশন এবং কমিউনিটি গণমাধ্যম।
উত্থানের নেপথ্যের নায়ক
ধীরে ধীরে জাবেদ ভাইয়ের মানবিক উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে মূলধারায়। নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তার প্রোগ্রামে কংগ্রেসম্যান, সিনেটর, সিটি কাউন্সিল সদস্যরা আসতে শুরু করেন। তখন থেকেই এস্টোরিয়া ওয়েলফেয়ার সোসাইটির খবর বাংলাদেশি মিডিয়াগুলিতেও গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হতে থাকে।
যে জোহরান মামদানি একসময় নিজের নিউজ প্রচারের জন্য আমার কাছে ধর্না দিতেন, আজ সেই জোহরান মামদানি বিশ্ব গণমাধ্যমের কাঙ্ক্ষিত মুখ। তার এই অভাবনীয় উত্থান দেখে আমার মন ভরে যায় গর্বে।
আজ অনেকেই জোহরান মামদানির মেয়র হওয়ার পেছনে নিজেদের অবদানের কথা বলছেন। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, তার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন জাবেদ উদ্দিন। জাবেদ ভাই না থাকলে হয়তো সেই সময় এস্টোরিয়ার মানুষ জোহরান মামদানিকে চিনতই না, ভোট দিত না।
