সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

৭১ এর এই দিনেঃ ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: ভারত ও ভুটানের স্বীকৃতির দিনে পাল্টে গেল যুদ্ধের গতিপথ।

Spread the love

মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য দিন। এদিন ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি ঘোষণা করেন। একই মুহূর্তে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, আর যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের প্রতি সমস্ত অর্থনৈতিক সহায়তা স্থগিত করে দেয়। দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থানরত মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য।

কিন্তু ততক্ষণে যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর পিছিয়ে পড়া শুরু হয়ে গেছে।‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তম অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ বর্ণনায় তুলে ধরেছেন এদিনের ঘটনাপ্রবাহ। ভারত ছাড়াও ভুটানও এই দিনেই স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও কে আগে স্বীকৃতি দিয়েছে তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল, ২০১৪ সালে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক নিশ্চিত করেন ভুটান ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগেই তারবার্তা পাঠিয়েছিল।

সাহিত্য ও গবেষণায় পাওয়া যায় ভুটানের রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুকের বার্তা, যেখানে তিনি বাংলাদেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের সাফল্যের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। লেখক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীও তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন ৬ ডিসেম্বরই ভুটান প্রথম স্বীকৃতি দেয়, কিছুক্ষণ পর ভারতও যোগ দেয়। একই দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ‘বাংলাদেশ বেতার’ নামে কার্যক্রম শুরু করে।যুদ্ধের ময়দানেও এদিন ছিল নাটকীয়।

মঈদুল হাসান তাঁর ‘মূলধারা ’৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন ভারতীয় স্বীকৃতি ঘোষণার দিনই পাকিস্তানের বিমান শক্তি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং স্থলভূমিতে তারা চরম চাপে পড়ে। পাকিস্তান সেনারা ঢাকা সমুদ্র উপকূলের দিকে পশ্চাদপসরণ শুরু করে।রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১-এর দশ মাস’ বইয়ে ৬ ডিসেম্বরের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তিনি বর্ণনা করেছেন “দিশেহারা পাকবাহিনীর প্রশাসনিক ধ্বস” হিসেবে।

সম্মিলিত বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন অগ্রযাত্রা, আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, এবং বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর অবরোধ সব মিলিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর পতন ছিল সময়ের অপেক্ষা।যশোরে, সিলেটে, আখাউড়া, লাকসাম, হিলি সব দিক থেকেই সম্মিলিত বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল। মুক্তিবাহিনীর ৬ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্বে ধরলা নদী পেরিয়ে কুড়িগ্রাম মুক্ত হয়। কয়েকটি সীমান্ত ঘাঁটি থেকে পাকবাহিনী ভোরের আগেই পিছু হটা শুরু করে। এদিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর ভাষণে বলেন স্বাধীনতার পবিত্র আলো বাংলাদেশের আকাশে উদ্ভাসিত।

বিশ্বের অন্যান্য দেশও শীঘ্রই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। একই দিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয় দিনের মতো ভেটো প্রয়োগ করে পাকিস্তানকে রক্ষার প্রচেষ্টায় আনা একটি প্রস্তাব ঠেকিয়ে দেয়।মাঠের বাইরে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত ১৩০ জন বাঙালি কূটনীতিক বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। তাদের প্রচেষ্টায় পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি আদায়ে বৈপ্লবিক গতি তৈরি হয়।৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তাই শুধু কূটনৈতিক স্বীকৃতির দিন নয় এটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *