সর্বশেষ
এপ্রিল ৯, ২০২৬

হিমেল স্পর্শে জাগে গ্রামীণ অর্থনীতি, গাছিদের কাছে খেজুর গাছ যেন ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’

Spread the love

শহীদুল ইসলাম শরীফ, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:কার্তিক শেষের বার্তা। হেমন্তের শেষে প্রকৃতিতে হিমেল স্পর্শ লাগতেই বদলে গেছে গ্রামীণ জনপদের দৃশ্যপট। শীতের আগমনী শুধু পিঠা-পুলি উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে না, বরং এর সঙ্গে শুরু হয়ে যায় এক ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি।

শীতকাল বাঙালির ভোজনবিলাসের মূল উপাদান খেজুরের রস ও গুড়। আর এই সময়েই যেন ভাগ্য বদলের আশায় তীব্র কর্মব্যস্ততায় মেতে ওঠেন রস সংগ্রহকারী গাছিরা।কার্তিক মাসের শেষ দিক থেকেই গাছিরা রস সংগ্রহের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেন।

এটি একাধারে শ্রমসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এই প্রস্তুতিতে প্রধানত দুটি ধাপ থাকে। গাছিরা ধারালো দা বা ‘গাছি দা’ দিয়ে খেজুর গাছের নির্দিষ্ট অংশ অত্যন্ত সাবধানে পরিষ্কার করে চাঁছেন। গাছিদের ভাষায় এটিই হলো ‘ঝোরা’ বা ‘তোলা’। চাঁছা অংশে এরপর সাবধানে বাঁশের চোঙ বা ‘নল’ স্থাপন করা হয়। এই নল বেয়েই রস ফোঁটায় ফোঁটায় মাটির হাঁড়ি বা ‘ঠিলা’ তে জমা হয়। সাধারণত সন্ধ্যার আগে হাঁড়ি বাঁধা হয় এবং পরের দিন ভোরে সংগ্রহ করা হয়।

গাছিদের অভিজ্ঞতায়, ভোরবেলা সংগৃহীত রস সবচেয়ে মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। এই রসকে তারা ‘জিরান কাঠ’ বা ‘সন্ধ্যা রস’ নামে অভিহিত করেন।ফরিদপুর থেকে রোজগারের টানে এই প্রথম দোহারে এসেছেন ৫৫ বছর বয়সি জালাল গাছি। তিনি জানান, “বছর ঘুরে আমরা এই শীতকালের অপেক্ষায় থাকি। এখন প্রতিটি খেজুর গাছই আমাদের জন্য সোনার ডিম পাড়া হাঁস।” জালাল জানান, তিনি বর্তমানে ২৫টি গাছে হাঁড়ি বাঁধেন কয়েক দিনের মথ্য গাছের সংথ্যা আরও বাড়বে।

বর্তমানে প্রতিটি হাঁড়িতে ১ থেকে ২ লিটার রস পাওয়া গেলেও, শীতের তীব্রতা বাড়লে অর্থাৎ পৌষ মাসে তা বেড়ে ৬ থেকে ৯ লিটার পর্যন্ত হবে। গাছের অর্ধেক রস তিনি পেয়ে থাকেন, তা থেকে তিনি প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা রোজগার করছেন। তিনি গুড় তৈরি করেন না কাঁচা রস বিক্রি করেন। বর্তমানে প্রতি লিটার রস বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকা দরে। তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে এখন গাছে হাঁড়ি বাঁধার পর তাতে নেট বা জাল জড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে পাখি বা পোকামাকড়ের কারণে রস দূষিত না হয়।

এই কয়েক মাস গাছিদের জীবন-জীবিকার মূল উৎস হয়ে ওঠে খেজুরের রস ও গুড়। খাঁটি গুড়ের চাহিদা থাকায় বাজারে এর দাম সব সময়ই চড়া থাকে। অনেক গাছি সরাসরি রস ও গুড় নিয়ে শহরতলির বাজারেও নিয়ে যান। এই শীত মৌসুমে তাদের সম্মিলিত ব্যবসা কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।তবে গ্রামীণ অর্থনীতির এই ঐতিহ্যবাহী ধারায় এখন বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। নগরায়ন ও অপরিকল্পিত বৃক্ষ নিধনের ফলে দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সুসংগঠিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ গাছিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *