[কলামে : অপু আবুল হাসান,সম্পাদকীয়]
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যানভাসে সিরাজ শিকদার এক অমীমাংসিত অধ্যায়। বুয়েটের মেধাবী প্রকৌশলী থেকে সর্বহারা পার্টির একনায়ক—তার জীবন যেন এক ঝোড়ো হাওয়া, যা একইসাথে মুগ্ধতা ও ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হিসেবে তার নাম ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তিনি কি ছিলেন নিছক এক রোমান্টিক বিপ্লবী, নাকি ভুল পথে চালিত এক চরমপন্থী নেতা?
তাত্ত্বিক মোহ ও একনায়কতন্ত্রের উত্থান
ষাটের দশকে যখন ছাত্র রাজনীতি উত্তাল, তখন সিরাজ শিকদার হেঁটেছিলেন ভিন্ন পথে। মাও সেতুংয়ের দর্শনে দীক্ষিত সিরাজ কেবল তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, ব্যক্তিগত জীবনেও ঘটিয়েছিলেন তার প্রতিফলন। বাসাবাড়ির গৃহকর্মীকে বিয়ে করে মায়ের হাতে তুলে দিয়ে তিনি যে শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। কিন্তু দলের ভেতরে সেই সিরাজই হয়ে ওঠেন চরম একনায়ক। ভিন্নমত দমনে তিনি ছিলেন নির্মম। দলের কর্মী বা চাকরিজীবী সদস্যদের ‘পেটি বুর্জোয়া’ আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করা কিংবা সামান্য বিচ্যুতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সংস্কৃতি তার দলের ভেতরই বিভীষিকা তৈরি করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও একসময়ের সহযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরকে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে, বিপ্লবের নামে তিনি কতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলেন।
একাত্তরের ‘দ্বিমুখী’ যুদ্ধ
১৯৭১ সালে যখন পুরো জাতি পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, সিরাজ শিকদার তখন লড়ছিলেন এক অদ্ভুত ‘দ্বিমুখী’ লড়াই। বরিশাল ও ঝালকাঠির পেয়ারা বাগানে ‘জাতীয় মুক্তিবাহিনী’ গড়ে তুলে তিনি যেমন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন, তেমনি মুজিবনগর সরকারকেও ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিরোধিতা করেছেন। তার আশঙ্কা ছিল, ভারতীয় সহায়তায় অর্জিত স্বাধীনতা বাংলাদেশকে দিল্লির উপনিবেশে পরিণত করবে। এই অতি-সতর্কতা ও আপোষহীন মনোভাব তাকে মূলধারার মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল।
স্বাধীন দেশে অস্থিরতার আগুন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিরাজ শিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’ সরকারের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করে। থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং গুপ্তহত্যার মাধ্যমে তিনি যে ‘শ্রেণী শত্রু খতম’ করার মিশনে নেমেছিলেন, তা স্বাধীনতাত্তোর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে অস্থিতিশীলতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৪ সাল—এই স্বল্প সময়ে হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি তার বিপ্লবকে জনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসে রূপ দেয়। বেরুবাড়ি হস্তান্তর ইস্যু কিংবা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতায় তার যুক্তি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, তার প্রয়োগপদ্ধতি ছিল আত্মঘাতী।
অন্তিম পরিণতি ও প্রাসঙ্গিকতা
১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজ শিকদারের গ্রেফতার ও পরবর্তী সময়ে পুলিশের হেফাজতে তার মৃত্যু স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কালো অধ্যায়। সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবের সেই উক্তি— “আজ কোথায় সিরাজ শিকদার?”—শাসকগোষ্ঠীর দম্ভের প্রকাশ ছিল নাকি দীর্ঘশ্বাস, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী সেনাদের কেউ কেউ সিরাজ শিকদারকে নিজেদের ‘গুরু’ মেনে এই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিও করেছিলেন।
পরিশেষে, সিরাজ শিকদার ছিলেন এমন এক বিপ্লবী, যিনি জনবিচ্ছিন্ন তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন সত্য, কিন্তু তার পথ ছিল রক্তক্ষয়ী এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী।
তার সম্মোহনী নেতৃত্ব তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল ঠিকই, কিন্তু বন্দুকের নলে বিপ্লব আনতে গিয়ে তিনি নিজেই সেই বারুদের আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়েছেন। ইতিহাসের কাঠগড়ায় সিরাজ শিকদার তাই এক ট্র্যাজিক হিরো, যার দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত, কিন্তু পথ ছিল ভুল।

