সর্বশেষ
এপ্রিল ১১, ২০২৬

লুণ্ঠিত অস্ত্রের ছায়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: আইনশৃঙ্খলায় বাড়ছে উদ্বেগ।

Spread the love

মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় পুলিশের থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনও উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় আড়াই লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ। এসব অস্ত্র দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

নির্বাচনের আগে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারঃ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার। ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই হত্যা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

শুধু ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ও যশোরে ঘটে যাওয়া দুটি হত্যাকাণ্ডেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।কীভাবে লুট হলো অস্ত্র ও গুলিঃ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পুলিশের থানা-ফাঁড়িসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি লুট করা হয়।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসা থেকেও লাইসেন্সধারী অস্ত্র লুট হয়। এসব অস্ত্র পরে হাতবদল হয়ে পেশাদার অপরাধী, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হাতে পৌঁছে যায়।লুটের অস্ত্র কারা ব্যবহার করছেঃ জানা গেছে, লুণ্ঠিত অস্ত্রের বড় একটি অংশ প্রথমে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে যায়। তারা এসব অস্ত্র কম দামে বিক্রি করে দেয় অপরাধী চক্রের কাছে।

পরে সেগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছায়। পুলিশ ও র্যাবের নজর এড়াতে পুরোনো সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি নতুন মুখের অপরাধীদের হাতেও এসব অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এমনকি ডাকাত দল, বনদস্যু, জলদস্যু ও অপহরণকারী চক্রের হাতেও লুটের অস্ত্র পৌঁছেছে।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ চিত্রঃ সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সরকার পতনের পর থানা-ফাঁড়ি ও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ১৩ হাজার ৯৯ রাউন্ড গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখনও ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল, এসএমজি, রিভলভার, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান।ধারাবাহিক সহিংসতার নজিরঃ তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা, কক্সবাজার, পাবনা, গাজীপুর ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ গুলিতে নিহত বা আহত হয়েছেন। অনেক ঘটনায় চাঁদা আদায় ও আধিপত্য বিস্তারই ছিল মূল উদ্দেশ্য।পুলিশের বক্তব্যঃ পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, লুণ্ঠিত অস্ত্রের বড় অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে যেসব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি, সেগুলো উদ্ধারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

তিনি অবৈধ অস্ত্র সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে পুলিশকে জানাতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র যত বেশি সময় উদ্ধারের বাইরে থাকবে, ততই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হবে।

জননিরাপত্তা ও জাতীয় নির্বাচনের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। টার্গেট কিলিং ও সংঘাত-সহিংসতায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *