মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার
বারবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে শুধু ভূমি নয় কেঁপে উঠেছে মানুষের মনও। রাজধানীসহ সারাদেশে গত শুক্রবার সকাল থেকে কয়েক দফা দুলুনিতে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তার রেশ এখনও কাটেনি।
কয়েক সেকেন্ডের আকস্মিক কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক আবাসিক ভবনের কাঠামো, প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন, আহত হয়েছেন সাত শতাধিক মানুষ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক ক্ষতির চেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে মানুষের মানসিক অবস্থায়, কারণ বাংলাদেশে তুলনামূলক কম ভূমিকম্প হওয়ায় প্রস্তুতিও কম।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৮০ জন, ভর্তি রয়েছেন ২০৩ জন। বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্য।
অনেকে ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পরও মনে করছেন ঘর নড়ছে, খাট দুলছে, মাথা ঘোরাচ্ছে ঘুম, মনোযোগ, স্বাভাবিক জীবন সবই ব্যাহত হচ্ছে। আতঙ্কে কেউ কেউ শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে চাইছেন।মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ইতোমধ্যে এসব উপসর্গ নিয়ে কয়েকজন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের আকস্মিকতা প্যানিক অ্যাটাক, বিভ্রান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, দুঃস্বপ্নসহ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে নারী ও শিশু এ ঝুঁকিতে বেশি।সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ জানিয়েছেন, ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি বারবার ফিরে আসা, সম্পর্কিত শব্দ বা দৃশ্য দেখে আতঙ্ক তৈরি হওয়া, আবেগ প্রকাশে সমস্যা, ঘটনা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা, মাথাব্যথা এসবই পিটিএসডির লক্ষণ। এ অবস্থায় ওষুধ, সাইকোথেরাপি, গ্রুপ থেরাপি, ইএমডিআরের মতো সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন।গবেষণায় একই চিত্র ভূমিকম্পের পর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপবিএমসি সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমিকম্পের পর প্রতি লাখে ১৮ হাজার মানুষের মধ্যে পিটিএসডি দেখা যায়।
তুরস্কে ২০২৩ সালের বড় ভূমিকম্পের পর এক বছরেও ব্যাপক ট্রমা রয়ে গেছে ৬০% মানুষ তীব্র পোস্ট-ট্রমাটিক উপসর্গ, ৪৪% উদ্বেগ এবং ৬১% বিষণ্নতায় আক্রান্ত। জাপান, চীন, নেপালসহ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে মানসিক পুনর্বাসন এখন জাতীয় নীতিমালার অংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ জরুরি।মানসিক চাপ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে পারে শারীরিক জটিলতাডা. জোবায়ের মিয়া জানান, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। প্যানিক অ্যাটাক নিয়ে বহু রোগী হাসপাতালে আসছেন। মানসিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
হাসপাতালগুলোতে দ্রুত সেবার জন্য বিশেষ ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাবার, আতঙ্ক সৃষ্টি করে এমন সংবাদ পরিহার, ধূমপান-মদ্যপান থেকে দূরে থাকা এবং স্বাভাবিক রুটিন বজায় রাখাই মানসিক চাপ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

