মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি বাতিল না করে ধাপে ধাপে পর্যালোচনার পথে হাঁটছে নতুন সরকার। আইনি জটিলতা এড়িয়ে যুক্তিসঙ্গত ও টেকসই সমাধান খোঁজাই এখন শিক্ষা প্রশাসনের অগ্রাধিকার এমন বার্তাই দিয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।গতকাল বুধবার সচিবালয়ে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “শেষ সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো আমরা একতরফাভাবে বাতিল করতে চাই না।
কোথাও তড়িঘড়ি হয়েছে কিনা, তা যাচাই করে প্রয়োজন হলে রিভিউ করা হবে।”ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ পর্যালোচনারাজধানীর সরকারি সাত কলেজকে একীভূত করে গঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি-এর চূড়ান্ত অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি। গেজেট প্রকাশের আগে-পরে প্রক্রিয়াগত কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং অধ্যাপক ড. এএস মো. আবদুল হাছিবকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অধ্যাদেশ রিভিউ হলে প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ ও একাডেমিক নীতিমালায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।এমপিওভুক্তি: যাচাইয়ের পালাজাতীয় নির্বাচনের আগে একযোগে ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রস্তাবও পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
দ্রুত এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্তে আর্থিক দায় ও যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি রিভিউ করার ইঙ্গিত দেন তিনি।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে গেলে মানোন্নয়নের সুযোগ বাড়বে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতার অপেক্ষায় থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।৮২ জনের পদোন্নতি: বিতর্কের কেন্দ্রেমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ৮২ জন কর্মচারীকে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (এটিইও) পদে পদোন্নতির বিষয়টিও পর্যালোচনায় যাচ্ছে। মন্ত্রী জানান, বিষয়টি আগে তাঁর নজরে ছিল না; এখন খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদোন্নতি পুনর্মূল্যায়ন করলে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের বার্তা আসবে। তবে ইতোমধ্যে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ এবং সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে অভিযোগসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৩৮৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। কোনো ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করলে নতুন করে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ মামলা জটিলতায় আটকে আছে।অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতি আস্থা ফিরবে। কিন্তু সামগ্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে গেলে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট তীব্র হতে পারে।সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পরীক্ষাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকারের এই ‘রিভিউ নীতি’ একদিকে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নীতিগত স্বচ্ছতার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় গেলে প্রশাসনিক গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে স্থিতিশীলতা, আইনি সুরক্ষা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষাই এখন মন্ত্রণালয়ের বড় চ্যালেঞ্জ। রিভিউ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে শিক্ষা প্রশাসনের ভবিষ্যৎ আস্থা ও গতি।

