মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত ৮ জন পাইলটের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক ও বাধ্যতামূলক উড্ডয়ন ঘণ্টা পূরণ না করেই ভুয়া নথি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে চাকরি গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জাল লগবুক, ভুয়া উড়ান ঘণ্টা এবং বিধিবহির্ভূত ছাড়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও পরিবহন পাইলট লাইসেন্স অর্জন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশের প্রচলিত বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিমান কর্তৃপক্ষ ৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল পাইলটরাই নয়, লাইসেন্স প্রদান ও তদারকি ব্যবস্থার মধ্যেও গুরুতর অনিয়ম রয়েছে।
এমনকি কিছু ফ্লাইট পরিদর্শকের বৈধ লাইসেন্স, শারীরিক সক্ষমতা এবং সাম্প্রতিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা পাইলট যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আকন্দের লাইসেন্সের জন্য যেখানে ন্যূনতম ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, সেখানে তার প্রকৃত উড়ান সময় ছিল মাত্র ১৫৪.৩৫ ঘণ্টা। ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের ক্ষেত্রে একই উড্ডয়ন ঘণ্টা দুবার লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। ক্যাপ্টেন আনিস, বাসিত মাহতাব, নুরুদ্দিন আহমেদ, ইউসুফ মাহমুদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ভুয়া তথ্য ও নথির অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাইলট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত, বিমান নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে যাত্রী নিরাপত্তা, এয়ারলাইন্সের সুনাম, আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনা এবং বিমা কার্যকারিতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, জাল সনদে চাকরি নেওয়া পাইলটদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং লাইসেন্স প্রদানের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত পাইলটদের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত উড়ান থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাইলট লাইসেন্স ইস্যু ও তদারকি ব্যবস্থার অনিয়ম আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) সংযোজনী-১ এর বিভিন্ন বাধ্যতামূলক মান লঙ্ঘন করছে। এতে বাংলাদেশের ক্যাটাগরি ওয়ান স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক অডিট এবং বৈশ্বিক এভিয়েশন মহলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।সমাধান হিসেবে সন্দেহভাজন লাইসেন্সধারীদের সাময়িকভাবে উড়ান থেকে বিরত রাখা, পূর্ণাঙ্গ অডিট পরিচালনা, পরিদর্শকদের যোগ্যতা যাচাই, ডিজিটাল লগবুক ও লাইসেন্স যাচাই ব্যবস্থা চালু এবং স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত সংস্কার, জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

