সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

পিঠা-পুলিতে রাঙা শীত, বাঙালির ঐতিহ্যের উৎসব

Spread the love

জহুরুল হক জনি, লালমনিরহাট প্রতিনিধি:

শীতকাল মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে পিঠার উৎসব। ঠান্ডা হাওয়ার পরশ লাগলেই যেন জিভে জল আনে নারিকেল, গুড়, চালের গুঁড়ার মিশ্রণে তৈরি বাহারি সব পিঠার গন্ধ।

বাংলার গ্রামীণ জীবনে শীত মানে শুধু ঠান্ডা নয়, বরং পিঠা-পুলি আর আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগির এক মৌসুম। নতুন ধানের চাল থেকে তৈরি আতপ চালের গুঁড়ো, খেজুর গুড় আর নারিকেলের সংমিশ্রণে পিঠা বানানো যেন শীতের আগমনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বাঙালির লোকজ ইতিহাস-ঐতিহ্যে পিঠাপুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। পিঠা-পায়েস সাধারণত শীতকালের রসনাজাতীয় খাবার হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত এবং মুখরোচক খাদ্য হিসেবে বাঙালি সমাজে বেশ আদরণীয়। আত্মীয়স্বজন ও পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় ও মজবুত করে তুলতে পিঠাপুলির উৎসব বিশেষ ভূূমিকা পালন করে। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম শীতকালেই বেশি পড়ে। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর বা সন্ধ্যায় গাঁয়ের বধূরা চুলার পাশে বসে ব্যস্ত সময় কাটান পিঠা তৈরিতে।

বিশেষ করে জামাইদের এ সময় দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো হয়। এ সময় খেজুরের রস থেকে গুড়, পায়েস এবং নানারকম মিষ্টান্ন তৈরি হয়। খেজুরের রসের মোহনীয় গন্ধে তৈরি পিঠা-পায়েস আরও বেশি মধুময় হয়ে ওঠে। শীতকালের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় পিঠা হচ্ছে ভাপা পিঠা। এ ছাড়া আছে চিতই পিঠা, দুধচিতই, ছিট পিঠা, দুধকুলি, ক্ষীরকুলি, তিলকুলি, পাটিসাপটা, ফুলঝুরি, ধুপি পিঠা, নকশি পিঠা, মালাই পিঠা, মালপোয়া, পাকন পিঠা, ঝাল পিঠা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে শতাধিক ধরনের পিঠার প্রচলন রয়েছে। কালের গভীরে কিছু হারিয়ে গেলেও এখনও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। শীতকালে শুধু গ্রামবাংলায়ই নয়, শহর এলাকায়ও শীতের পিঠা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। ইদানীং শহরেও পাওয়া যায় শীতের পিঠার সুবাস।শীত এলে শহর এলাকার বিভিন্ন ফুটপাত, জনবহুল এলাকা, বিভিন্ন টার্মিনালে পিঠা বিক্রির ধুম পড়ে যায়। যদিও খোলামেলা স্থানে এসব পিঠা তৈরি ও বিক্রি সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর, এর পরও এ ব্যবসা বিশেষ করে ভাপা পিঠা বিক্রি শীতকালে বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে।

এক সময় সোনার বাংলায় যেমন শত শত নামের ধান ছিল, তেমনি সেসব ধানের পিঠারও অন্ত ছিল না। কত কী বিচিত্র নামের পিঠা! পিঠা তৈরি ছিল আবহমান বাংলার মেয়েদের ঐতিহ্য। পিঠা-পায়েসকে নিয়ে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে এখনও অসংখ্য গান-কবিতা ও ছড়া প্রচলিত। পিঠাকে কেন্দ্র করে বিখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন, ‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে বিষম খেয়ে/ আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’ পিঠাপুলি আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও গ্রামবাংলায় এসব পিঠা-পার্বণের আনন্দ-উদ্দীপনা এখনও মুছে যায়নি।

আজকাল শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁতেও গ্রামবাংলার পিঠাপুলি জায়গা করে নিয়েছে। তাছাড়া শহরের প্রতিটি গলিতে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে এখন পিঠা বিক্রি হয়।শহরের নাগরিক জীবনেও আজকাল পিঠা উৎসব হয়, কিন্তু গ্রামে এর আবেদন ভিন্নরকম। মাঠের ধান ঘরে ওঠার আনন্দ, নতুন চালের ঘ্রাণ আর পারিবারিক একতা মিলেই যেন পিঠাকে করে তোলে শীতের পরম আনন্দদায়ী রসনা বিলাস। শীত এলেই তাই আমাদের মনে পড়ে মায়ের হাতের ভাপা পিঠা, দাদীর তৈরি পাটিসাপটা।এই ঐতিহ্য ধরে রাখাই এখন সময়ের দাবি। পিঠা-পার্বণের এ আনন্দ ও ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে টিকে থাকুক বাংলার ঘরে ঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *