কাজী সাজিদ আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT-BD) গঠনের এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও, এর বিচারিক রায়গুলো একদিকে যেমন জাতির বহুপ্রত্যাশিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে, তেমনি অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ‘প্রসিডিউরাল ফেয়ারনেস’ (Procedural Fairness) ও ন্যায্য বিচার নিয়ে গভীর প্রশ্ন টেনে এনেছে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই বিশেষ আদালতটি দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়বিচার বনাম পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার চিরন্তন দ্বন্দ্ব।আইসিটি-বিডি-র প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় প্রত্যাশা: মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ চার দশক পর, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করার জন্য International Crimes (Tribunals) Act, 1973-এর অধীনে আইসিটি-বিডি পুনরুজ্জীবিত করে।
দেশজুড়ে তরুণ সমাজ ও আপামর জনসাধারণ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের মতো আন্দোলন শুরু হয়, যা দ্রুত বিচারের দাবিকে এক ‘ম্যাসিভ’ (Massive) গণদাবিতে পরিণত করে। প্রথমদিকের রায়গুলিতে, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আসা মৃত্যুদণ্ডগুলো, দেশের ভেতরে বিপুল জনসমর্থন পায়।
ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা সহ একাধিক অভিযুক্তকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা কার্যকরও করা হয়েছে। এটি দেশের বহু নির্যাতিত ও শহীদ পরিবারের জন্য এক ঐতিহাসিক ‘বিতর্কিত মাইলস্টোন’ (Controversial Milestone) হিসেবে দেখা হয়।আন্তর্জাতিক উদ্বেগ: ন্যায্য বিচার ও মৃত্যুদণ্ড: জাতীয়ভাবে বিপুল জনসমর্থন ও স্বীকৃতি লাভ করা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে বারংবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের মূল প্রশ্নগুলো ছিল আইনি পদ্ধতির মানদণ্ড, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে।হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই সমালোচনা করে বলেছে যে, “এই বিচারগুলো অত্যন্ত সমস্যাসঙ্কুল, যেখানে বিচারকদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্ন রয়েছে।”
এইচআরডব্লিউ অভিযোগ করে যে, আসামিপক্ষের আইনজীবীদের হুমকি বা হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে ঘাটতি ছিল, যা আন্তর্জাতিক ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ (Fair Trial) মানদণ্ড লঙ্ঘন করে।অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) তাদের বিবৃতিতে ICT-BD-এর রায়গুলিকে “ন্যায়সঙ্গত বিচারের অভাব” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা বিশেষভাবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহারকে “নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০১৩ সালে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর অ্যামনেস্টি উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, বিচারিক আপিলের সুযোগ সীমিত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। তারা বাংলাদেশ সরকারকে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে এর ব্যবহার স্থগিত করার আহ্বান জানায়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দফতর (OHCHR) একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে যে, ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (ICCPR) ১৪ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। OHCHR স্পষ্ট করে দেয় যে, যদি কোনো বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে না চলে, তবে এর ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তা জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন হতে পারে।
তারা ভিকটিমদের জন্য বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও, তা অবশ্যই স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়া জরুরি বলে জোর দেয়। “আমরা বাংলাদেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার স্থগিত করে এবং সকল বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ন্যায়বিচার অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে।” — OHCHR-এর বিবৃতি থেকে উদ্ধৃতি।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিরোধীদলের প্রতিক্রিয়া: বিচার শুরুর পর থেকেই এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ‘পোলারাইজেশন’ (Polarization) সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিচার প্রক্রিয়াকে ‘জাতিগত পাপমোচন’ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, অভিযুক্তদের দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের প্রধান রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই বিচারগুলোকে “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার” হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছে। বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, ট্রাইব্যুনাল কেবল বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং বিচারকদের বিরুদ্ধে সরকার-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছে।
এই রাজনৈতিক বিতর্ক দেশে বড় ধরনের সহিংসতা ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা বিচার চলাকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর চাপ সৃষ্টি করে।সাক্ষ্য সুরক্ষা ও বিচারিক পদ্ধতির প্রশ্ন: বিশেষজ্ঞরা ট্রাইব্যুনালের দুটি পদ্ধতিগত দুর্বলতা নিয়ে বারবার আলোচনা করেছেন:১. সাক্ষ্য সুরক্ষার অভাব: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। কিন্তু ICT-BD-এর ক্ষেত্রে সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচির দুর্বলতা থাকার অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে অনেকে সাক্ষ্য দিতে ভয় পেয়েছেন বা অনেকে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
২. ‘ইন অ্যাবসেন্টিয়া’ (In Absentia) বিচার: অভিযুক্ত পলাতক থাকলে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত রায় দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এই পদ্ধতি ন্যায্য বিচারের অধিকারকে ব্যাহত করতে পারে বলে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো মনে করে।সংক্ষেপে বলা যায়, আইসিটি-বিডি-এর উত্তরাধিকার এক দ্বিমুখী বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে: একদিকে এটি জাতীয় ইতিহাসে বহুকাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে, যা জাতিকে একাত্তরের ট্র্যাজেডি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
একইসাথে, পদ্ধতিগত দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতি প্রতিশ্রুতির অভাবের কারণে এর বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সীমিতই রয়ে গেছে। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো পরামর্শ দিয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও পুনর্মিলন নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে অবশ্যই বিচার প্রক্রিয়ার সকল অভিযোগের ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেশন’ (Independent Investigation) করতে হবে, আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, এবং সর্বোপরি—মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির উদ্বেগগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারগুলো শুধুমাত্র আইনি রায় ছিল না; তা ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
এই ট্রাইব্যুনাল জাতি হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো কেবল অপরাধীদের শাস্তি নয়, বরং বিচারের প্রক্রিয়া যেন প্রশ্নাতীতভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলে।
ICT-BD-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, অতীতকে মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা—দুটিই সমান ‘ভাইটাল’ (Vital)।

