সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

গণমাধ্যমের ওপর চড়াও মব: গভীর সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস

Spread the love

কাজী সাজিদ আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা:

ঢাকার কারওয়ান বাজারে গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এর রাতে দেশের প্রধান দুটি সংবাদমাধ্যম— ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে যে বর্বরোচিত হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমাদের চোখের সামনে যখন দেখি সাংবাদিকরা ধোঁয়ায় দমবন্ধ অবস্থায় নিজ দপ্তরে আটকা পড়ে আছেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই অস্থিরতা দ্রুতই গণমাধ্যমের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণে রূপ নেয়, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে আবারও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ কিছুটা উন্নতি দেখালেও (১৪৯তম), সাম্প্রতিক এই হামলা সেই অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF) এই পরিস্থিতিকে পুনরায় ‘অত্যন্ত গুরুতর’ হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।এই আক্রমণের রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে গণমাধ্যমের ওপর এমন আঘাত নির্বাচনের সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে। তথ্য উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দুঃখ প্রকাশ এবং ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর দ্বিতীয় পর্যায় ঘোষণা করা হলেও, মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং ‘ডিজিটাল ওয়ারেন্ট’-এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে হামলা চালানোর প্রবণতা এক ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় প্যারালাইসিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট মামলার অভাব দেখিয়ে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ‘মব’ নিজেই সমান্তরাল এক বিচারিক কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়।

এটি কেবল সাংবাদিকতা নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যেমন ছায়ানট বা উদীচীর ওপর হামলাকেও বৈধতা দিচ্ছে, যা দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত হানছে।অর্থনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ এখন এক চরম ঝুঁকির মুখে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইতিমধ্যে ১০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন এবং ২৫০-এর বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের ওপর হামলা ও অস্থিতিশীলতা বিদেশি ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বার্তাই দিচ্ছে যে বাংলাদেশে আইনের শাসন অনুপস্থিত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সিভিবিসাস (CIVICUS) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইতিমধ্যে সাংবাদিক হয়রানি ও বিচারহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের জিএসপি (GSP) সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যদি এই মব কালচার এখনই কঠোরভাবে দমন করা না হয়, তবে ২০২৬-এর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বাংলাদেশ এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার ও বিশৃঙ্খলার গহ্বরে নিমজ্জিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *