সর্বশেষ
মার্চ ১৭, ২০২৬

কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতির তদন্ত শুরু, কিন্তু ২০০৯ থেকে ১৩ বাদ কার স্বার্থে এই পাঁচ বছর?

Spread the love

মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার:

গত এক দশকে বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কে তদন্তের আওতায় আনা হলেও ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের বিতর্কিত পাঁচ বছর বাদ পড়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে কার স্বার্থে এই সময়কাল তদন্তের বাইরে রাখা হলো?পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির গত ১৫ মার্চ জারি করা এক অফিস আদেশে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গত দশকে কনস্টেবল নিয়োগে সম্ভাব্য সব ধরনের অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা খতিয়ে দেখতে জেলা পর্যায়ে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।প্রতিটি কমিটির নেতৃত্ব দেবেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার। সদস্য হিসেবে থাকবেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ অফিস ইন্সপেক্টর। আগামী ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এসব কমিটিকে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়েছে।তদন্তে বিশেষভাবে ছয়টি বিষয় খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়োগ পাওয়া, ভিন্ন জেলার প্রার্থীকে জমি ক্রয়ের কাগজ দেখিয়ে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে চাকরি দেওয়া, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে আলাদা কক্ষে বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রার্থীকে যোগ্য বা অযোগ্য ঘোষণা করা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বরের অস্বাভাবিক তারতম্য এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা।

পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত অসাধু পুলিশ সদস্য, দালালচক্র বা প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কতটা ব্যবস্থা নিয়েছেন তাও তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।তবে তদন্তের আওতায় ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়কাল না থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সময়কে ঘিরেই কনস্টেবল নিয়োগে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে মনে করেন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের প্রশ্ন সবচেয়ে বিতর্কিত সময়কালই যদি বাদ পড়ে, তাহলে তদন্তের পরিধি কতটা কার্যকর হবে?এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কনস্টেবল নিয়োগ-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

আপাতত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ বা অভিযোগ পাওয়া গেলে আগের সময়কালও বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কনস্টেবল নিয়োগের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকে প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপারের হাতে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় এক লাখ ট্রেইনি কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।সে সময় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলেও মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো সুপারিশ তালিকার ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব নিয়োগে প্রার্থীপ্রতি পাঁচ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও ছিল।জেলা কোটা পদ্ধতির কারণে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি নিয়োগের সুযোগ থাকলেও স্থায়ী বাসিন্দা কম থাকায় অনেক প্রার্থী সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, আশুলিয়া, দোহার ও নবাবগঞ্জ এলাকায় জমি কিনে বা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে আবেদন করতেন।নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকায় ২০১৮ সালে তৎকালীন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী হঠাৎ করে কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করেন। পরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ তদারকি দল পাঠানো হয় এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে কাউকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করার কঠোর নীতি চালু করা হয়।

এর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাব, ডিও লেটার এবং উচ্চপর্যায়ের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।এদিকে কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে মাদারীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার ও ডিআইজি সুব্রত কুমার হালদারকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। ২০১৯ সালে মাদারীপুরে কর্মরত অবস্থায় পরীক্ষার খাতায় সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে ১৭ প্রার্থীর কাছ থেকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।সামগ্রিকভাবে অতীতের নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নতুন করে তদন্ত শুরু হলেও ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিতর্কিত সময়কাল তদন্তের বাইরে থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *