মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। সরাসরি বাণিজ্যের হিসাবে ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেন খুবই সীমিত বছরে গড়ে এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক আকাশপথ এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সম্ভাব্য চাপের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের মূল জায়গা সরাসরি রপ্তানি আমদানি নয়; বরং তেল ও এলএনজির আন্তর্জাতিক দাম, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।
ফলে ইরান পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরোক্ষ ঝুঁকি।বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)–এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ইরান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। এর মধ্যে বড় অংশই বাংলাদেশের রপ্তানি; বিপরীতে ইরান থেকে আমদানি খুবই সীমিত, অনেক বছর আবার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদেশগুলোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যাংকিং লেনদেন জটিল। সরাসরি ক্রেতা না থাকায় বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক খুব কমই যায়; তবে দুবাই হয়ে কিছু পণ্য ইরানে প্রবেশ করে।তার মতে, সরাসরি বাণিজ্য কম হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পরোক্ষ ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী অচল বা ঝুঁকিপূর্ণ হলে জাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় বিধিনিষেধ থাকলে কার্গো ফ্লাইটও ব্যাহত হতে পারে, যা জরুরি রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি তেল ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি খাতে চাপ বাড়বে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইরানে ১ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক রয়েছে। আগের বছরগুলোতেও রপ্তানির পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটির ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করেছে।অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ডলারের পণ্য। আগের তিন অর্থবছরে আমদানি ছিল শূন্য; ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ডলার।তবে এক দশক আগে চিত্র ভিন্ন ছিল।
২০১০-১১ অর্থবছরে ইরান থেকে ৪৪৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছিল। পরের বছরই তা কমে দাঁড়ায় ৯৯ কোটি টাকায়, এরপর ধারাবাহিকভাবে আমদানি হ্রাস পায়।সব মিলিয়ে, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য সীমিত হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলে তার অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে এমন আশঙ্কাই এখন সামনে আসছে।

