সম্পাদকীয় :প্রতিবেদক অপু আবুল হাসান
গত দেড় বছরে গাজায় ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী এই অঞ্চলটিতে সংঘাতের কোনো বিরতি নেই। আরব ইসরাইল যুদ্ধ ইরান ইরাক যুদ্ধ বা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ—এই ভূখণ্ডে রক্তপাত যেন এক চিরন্তন সত্যে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, ধর্ম সংস্কৃতি ও ইতিহাসগত সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও কেন এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশ বছরের পর বছর ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত? অনুসন্ধান বলছে, এর প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক বিভাজন, তেলের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলির প্রক্সি যুদ্ধ।দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর ধরে এই এলাকায় অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজত্ব ছিল। তবে ১৯০০ সালের পর ইউরোপীয় শক্তি বিশেষত ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চদের হাতে এই সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যানরা জার্মানিকে সমর্থন দিলে ব্রিটিশরা এই সুযোগ কাজে লাগায়। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ কূটনীতিক স্যার মার্ক সাইকেস এবং ফ্রান্সিস জর্জ পিকট গোপনে একটি ম্যাপ তৈরি করেন যা সাইকেস-পিকট চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষের আগেই অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুবিশাল এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এই বিভাজনের সময় স্থানীয় মানুষের জাতি ধর্ম বা জাতিগত আবেগের কোনো প্রকার গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই ঔপনিবেশিক বিভাজনের ফলে কুর্দ জনগোষ্ঠীর মতো জাতিগোষ্ঠীগুলিকে ইরান তুর্কি সিরিয়া ও ইরাকের মতো একাধিক দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় যা আজও তাদের মধ্যে আলাদা দেশের দাবি ও সশস্ত্র বিদ্রোহকে জিইয়ে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ ইরাক গঠনের সময়ও মাসুল বাগদাদ ও বাসরা এই তিনটি ভিন্ন জাতি ও ধর্মগোষ্ঠীর প্রভিন্সকে একজোট করা হয়েছিল।এদিকে ১৯০৮ সাল থেকে এই অঞ্চলে তেলের বিপুল ভান্ডার আবিষ্কৃত হতে থাকে। বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ তেলের মজুদ এই কয়েকটি দেশের মধ্যে থাকায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ব্রিটিশরা প্রথমে ইরানের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ালেও পরবর্তীতে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ নিজ প্রক্সি শক্তিকে সমর্থন দিয়ে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এই সময়েই ইউরোপে থাকা ইহুদিদের জন্য প্যালেস্তিনিদের এলাকায় ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যা বেলফোর্ড ডিক্লারেশন নামে পরিচিত। ১৯৪৭ সালের পর ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করলে আরব দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সংঘাতের ফলস্বরূপ ৭ লক্ষ প্যালেস্তিনি লেবাননে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন যা লেবাননের আভ্যন্তরীণ খ্রিস্টান মুসলিম জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করে এবং পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়।বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জামাল আব্দুল নাসিরের নেতৃত্বে ইজিপ্টে প্যান আরব ন্যাশনালিজমের উত্থান হলেও পশ্চিমা দেশগুলির বন্ধু সৌদি আরব ও কুয়েতের বিরোধিতার কারণে তা পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। এরপর ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনীর শিয়া মতাদর্শ ভিত্তিক শাসন শুরু হলে তা সুন্নি শাসক সাদ্দাম হোসেনের কাছে এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৮০ সালে ইরান ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে সৌদি আরব কুয়েত ও আমেরিকা সাদ্দামকে সমর্থন দেয় যা মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া সুন্নি প্রক্সি সংঘাতের বীজ বপন করে।পরবর্তীতে ইরাকের বিপুল আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে কুয়েতের সঙ্গে সাদ্দামের বিবাদ হয় এবং সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করেন। পশ্চিমা বিশ্বের হস্তক্ষেপে কুয়েত স্বাধীন হলেও আমেরিকা এই আরব দেশগুলিতে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে যা আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরদার করে। ২০১১ সালের আরব স্প্রিং আন্দোলন দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি চাইলেও তা বরং বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করে। সিরিয়া হয়ে ওঠে রাশিয়া ও আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান। এভাবেই এক শতাব্দী প্রাচীন ঔপনিবেশিক বিভাজন, তেলের রাজনীতি ও পরাশক্তির হস্তক্ষেপের কারণে মধ্যপ্রাচ্য আজও এক অন্তহীন সংঘাতের শিকার।

