ডেক্স রিপোর্ট:
ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। রবিবার বেইজিং এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে মাদুরোর মুক্তির দাবি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে চীন হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ভেনিজুয়েলার সরকার পরিবর্তনের এই জোরপূর্বক প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ওয়াশিংটন একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে ভেনিজুয়েলা থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। এই ঘোষণার পরই বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ভেনিজুয়েলার অন্যতম প্রধান মিত্র চীন এই ঘটনার কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বেইজিং জানিয়েছে, তারা মাদুরো ও তার স্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এই আধিপত্য বিস্তার বা ‘হেজিমনি’ চীনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অ্যান্ডি মক আল জাজিরাকে জানান, মার্কিন অভিযানের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই চীনা প্রতিনিধিদল ভেনিজুয়েলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল। তিনি বলেন, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে ওয়াশিংটনের এমন আচরণে বেইজিং খুব একটা অবাক হয়নি। তবে যেভাবে সামরিক কায়দায় একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নেওয়া হয়েছে, তা চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ।
উল্লেখ্য, চীন ভেনিজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এছাড়া লাতিন আমেরিকা জুড়ে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও মনরো ডকট্রিন বা ওই অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের নীতিতে ফিরে যায়, তবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা আরও বাড়বে।
তবে সামরিক বিশ্লেষক শন রেইন মনে করেন, চীন এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হলেও সামরিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল সামরিক ঘাঁটি নেই। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে ৮০০টি ঘাঁটি রয়েছে, চীনের সেখানে মাত্র দুটি। তাই বেইজিং মূলত কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা জানানোর পথেই হাঁটবে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের পথে হাঁটার সম্ভাবনা কম।
এদিকে মাদুরোকে আটকের ঘটনায় বিশ্বনেতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ব্রাজিল, কলম্বিয়া, চিলি এবং মেক্সিকোর মতো বামপন্থী সরকারগুলো মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডরের মতো ডানপন্থী সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।
উত্তর কোরিয়া এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর জঘন্য আঘাত বলে অভিহিত করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণকে দস্যুবৃত্তি ও বর্বরোচিত বলে আখ্যায়িত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পরিস্থিতি শান্ত করার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদক চক্র এবং দুর্নীতি দমনের অংশ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো এবং ইরানের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার জোট এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: আল জাজিরা

