ডেস্ক রিপোর্ট
Newsbd24live:
সম্প্রতি বাংলা এডিশনের এনওসি (অনাপত্তি পত্র) বাতিলের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি দেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাষ্ট্র যখন কোনো গণমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়, তখন তার পেছনে সুস্পষ্ট কারণ, লিখিত ব্যাখ্যা এবং আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কারণ, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী গণমাধ্যম পরিচালনা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অন্যতম মৌলিক অধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ বা মালিকানা পরিচয়ই অপরাধের মাপকাঠি হয়, তবে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই যুক্তিতে সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, টিপু মুনশির এভারকেয়ার, এস আলম গ্রুপ কিংবা বিগত সরকারের প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হয়নি।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—এই সিদ্ধান্ত কি আদৌ আইনের শাসনের (Rule of Law) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এটি একটি বৈষম্যমূলক প্রশাসনিক পদক্ষেপ?
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো, আইনের নির্বাচিত প্রয়োগ (Selective application of law) ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। একই ধরনের পরিস্থিতিতে এক পক্ষকে শাস্তি প্রদান এবং অন্য পক্ষকে ছাড় দেওয়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’র সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আইনজ্ঞদের মতে, বাংলা এডিশনের এনওসি বাতিলের প্রক্রিয়ায় ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ বা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি মানা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। প্রশাসনিক আইনের স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, অর্থাৎ শোকজ নোটিশ বা শুনানি ছাড়া কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ‘No one should be condemned unheard’—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নীতির ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য নয়। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হলে উচ্চ আদালতে এই সিদ্ধান্ত ‘স্বেচ্ছাচারী’ (Arbitrary), ‘অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ (Malafide) এবং ‘অসাংবিধানিক’ (Unconstitutional) হিসেবে গণ্য হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, দেশের কিছু প্রভাবশালী মিডিয়া হাউস এবং আন্তর্জাতিক লবি, যারা সচরাচর গণমাধ্যমের স্বাধীনতানিয়ে সরব থাকেন, বাংলা এডিশনের ইস্যুতে তাদের নীরবতা জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই নীরবতাকে অনেকেই সুবিধবাদী এবং দ্বিমুখী আচরণ হিসেবে দেখছেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যদি সার্বজনীন হয়, তবে প্রতিবাদও হওয়া উচিত দল-মত নির্বিশেষে।
জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শহীদ হাদির জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, জনমনে ক্ষোভ এখনো প্রশমিত হয়নি। প্রশাসনিক কলমের খোঁচায় নেওয়া কোনো অন্যায্য সিদ্ধান্ত এই ক্ষোভকে দমানোর পরিবর্তে নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্র যদি বারবার যুক্তিহীন ও বৈষম্যমূলক আচরণের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পথ প্রশস্ত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল।

