সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রায়: ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড

Spread the love

কাজী সাজিদ আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ (crimes against humanity) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)।

রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, এই রায় শেখ হাসিনার বিয়ের দিনই ঘোষিত হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং কূটনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

ইতিহাসে এটি প্রথমবারের মতো কোনো নারী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দণ্ড দেওয়ার ঘটনা।তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানির পর রায়ে উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস গণঅভ্যুত্থান দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “অভিযুক্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘন করেছেন।”

একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশে ইতিহাসগতভাবে কখনো কোনো নারীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়নি।

স্বাধীনতার পর বহু নারী আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও, তাদের দণ্ড সাধারণত জীবনবন্দী (Life Imprisonment) করা হয়েছে বা পরে বদলে দেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, নারী আসামিদের ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ায় লিঙ্গভিত্তিক সহানুভূতি বা বৈষম্য বিদ্যমান।

উদাহরণস্বরূপ, শারিফা বেগম ২৪ বছর ডেথ রো-তে থাকার পর সর্বোচ্চ আদালত তার দণ্ড জীবনবন্দী করেছিল। এই ঐতিহাসিক তথ্যটি ‘শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার ঘটনাটির বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আইসিটি আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশে অনুপস্থিত এবং ট্রাইব্যুনালে হাজির হননি। ফলে কার্যত তিনি আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রায়টি in absentia (অনুপস্থিতিতে) হওয়ায় আপিল টেকনিক্যালি সম্ভব হলেও বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করলে বা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যর্পিত হলে রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

রায় ঘোষণার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক অবস্থান দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। নির্বাসনে থাকা একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর নিরাপত্তা, ভিসা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়—all আন্তর্জাতিক মহলে পুনর্মূল্যায়নের মুখে। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলো তাকে নিয়ে আর “অসীম স্বাধীনতা” দেখাতে পারবে না, কারণ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দণ্ডপ্রাপ্ত।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ট্রাইব্যুনালের ন্যায়পরায়ণতা, বিচার প্রক্রিয়ার মানদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সরকারি বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া এবং শত শত নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন তুলেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিভিন্ন জায়গায় “গণহত্যার মতো পরিস্থিতি” তৈরি হয়েছিল। এই সহিংসতার দায়েই আজকের রায় এসেছে, যা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন তিন ভাগে বিভক্ত।

কিছু দল এটিকে ন্যায়ের বিজয় হিসেবে দেখছে, অন্যরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলে সমালোচনা করছে। নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও জটিল হতে পারে। আওয়ামী লীগ এই রায়কে “ক্যাঙ্গারু কোর্টের সিদ্ধান্ত” হিসেবে সমালোচনা করেছে।গবেষকরা মনে করছেন, এই রায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান উদাহরণ।

এটি ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক করবে। অনেকেই এটিকে রাজনীতিতে “দায়মুক্তির যুগের” অবসানের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।বাংলাদেশের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং কূটনীতির ভবিষ্যৎ এখন তিনটি প্রশ্নের উত্তরে নির্ভর করছে। শেখ হাসিনা কি দেশে ফিরবেন? ভারত কি তাঁকে প্রত্যর্পণ করবে? এবং রায় কি বাস্তবে কার্যকর হবে? এই তিনটি প্রশ্ন আগামীদিনে দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *