সর্বশেষ
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বেড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা, সংকটে বিদ্যুৎ খাত।

Spread the love

মোঃ শাহনুর রহমান লিমন, স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকাঃ

গত বছরের জুন মাসে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পাওনা যেখানে ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে দেশীয় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর পাওনা এভাবে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বিল পরিশোধ বিলম্বিত করে বকেয়া জমিয়ে রাখছে। তাদের ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি দেখানো এবং নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক তৈরির উদ্দেশ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপপা) জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৩০টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকায়, যার অনেকটাই ৮ থেকে ১০ মাস ধরে পরিশোধ হয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রমজানের আগেই মোট বকেয়ার অন্তত ৬০ শতাংশ পরিশোধের দাবি জানিয়েছে তারা। দাবি পূরণ না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেছেন কেন্দ্র মালিকরা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিপপা নেতারা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি ডেভিড হাসনাত, সাবেক সভাপতি ইমরান করিম, পরিচালক নাভিদুল হক এবং ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী। লিখিত বক্তব্যে ইমরান করিম জানান, দীর্ঘদিন বিল বকেয়া থাকার ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণের চাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন ব্যয় ও জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করছে।বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে বিপিডিবি বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত রাখার আইনগত অধিকার রয়েছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর।

তবে জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তারা কখনোই সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেনি। বিপুল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণ নিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বকেয়ার কারণে উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হলে জাতীয় লোড বণ্টন কেন্দ্র বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা দেখিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানা (লিকুইডেটেড ড্যামেজ) আরোপ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কাগজে-কলমে বিপিডিবির বকেয়া কম দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই জরিমানা চাপানো হচ্ছে।

কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বকেয়া বিল থেকে জরিমানার অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছে।এছাড়া একই ধরনের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও আদানি ও চীনা মালিকানাধীন বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে জরিমানা না করা বা পরে ফেরত দেওয়ার অভিযোগ তুলে বৈষম্যের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা।বিপপা জানায়, প্রায় ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জরিমানার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে সালিশ আবেদন করলেও চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সেই আবেদন খারিজ করা হয়েছে এবং বিপিডিবির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও জরিমানা কর্তন অব্যাহত রয়েছে।সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, বকেয়া অর্থ পরিশোধ না হলে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।

আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাপক লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে উঠবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এই সংকট বর্তমান ও আসন্ন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *