ডেস্ক রিপোর্ট:
তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাত একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। বায়ারাকতার টিবি-২ এবং আকিনচির মতো বিশ্বকাঁপানো ড্রোনের পর এবার দেশটি বিশ্বের সামনে উন্মোচন করল অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ন্যানো ড্রোন বা হেলিকপ্টার। ‘ন্যানোআল্প’ নামের এই খুদে রোবটিক আকাশযানটি একাধারে গোপনে নজরদারি এবং প্রয়োজনে আত্মঘাতী বা কামিকাজি মিশনে ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
উলুদোগান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি টেকনোলজি ইনকর্পোরেটেড নামের তুর্কি প্রতিষ্ঠান এই যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মাত্র ২৫ সেন্টিমিটার আকারের এই ড্রোনটি তৈরিতে বিগত কয়েক বছর ধরে তারা নিবিড় গবেষণা চালিয়েছে। তুরস্কের সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল বা টিউবিটাকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর-এন্ড-ডি সাপোর্ট প্রোগ্রামের আওতায় এই প্রজেক্টটি আলোর মুখ দেখেছে।
ন্যানোআল্পের কারিগরি সক্ষমতা সামরিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। মাত্র ১০০ গ্রাম ওজনের এই হেলিকপ্টারটি নিজের ওজনের দ্বিগুণেরও বেশি অর্থাৎ ৩৫০ গ্রাম পর্যন্ত পেলোড বা ভার বহন করতে পারে। এর গঠনশৈলী এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এটি রাডারে ধরা পড়ে না বললেই চলে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর শব্দহীন উড্ডয়ন ক্ষমতা। তুর্কি প্রযুক্তিবিদদের দাবি, উড্ডয়নের সময় এই ন্যানো হেলিকপ্টারের যান্ত্রিক শব্দ মাত্র ১০ মিটারের বাইরে শোনা যায় না। ফলে শত্রুপক্ষের অজান্তেই তাদের ডেরায় ঢুকে গোপন তথ্য সংগ্রহ কিংবা অতর্কিত হামলা চালাতে এটি অদ্বিতীয়।
প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা মাইক্রো-ইউএভি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ফলে জিপিএস সংযোগ ছাড়াই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ চলতে সক্ষম। উন্নত সেন্সর ফিউশন প্রযুক্তির কল্যাণে এটি প্রতিকূল পরিবেশেও নিখুঁতভাবে মিশন পরিচালনা করতে পারে।
নরওয়ের ব্ল্যাক হর্নেট ড্রোনের পর তুরস্কই দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এমন জটিল ও ফিউচারিস্টিক প্রযুক্তি আয়ত্তে আনল। ২০১০ সালে নরওয়ে প্রথম এই ধরনের ন্যানো হেলিকপ্টার তৈরি করে যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পরাশক্তির হাতে রয়েছে। এবার সেই অভিজাত ক্লাবে নাম লেখাল তুরস্ক।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ন্যানোআল্পের সংযোজন দেশটির সামরিক সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিশেষ করে এর মাধ্যমে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় শিল্পকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার যে ভিশন তুরস্ক নিয়েছে, তা আরও একধাপ এগিয়ে গেল। উলুদোগান ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির তথ্যমতে, শুধু তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সামরিক চাহিদাই এত বেশি যে, এখান থেকে বছরে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এই ড্রোনের ব্যাপক চাহিদা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
বায়ারাকতার ও কিঝিলেলমার মতো বড় পরিসরের কমব্যাট ড্রোনের পাশাপাশি ন্যানোআল্পের মতো ক্ষুদ্র কিন্তু কার্যকরী প্রযুক্তির উদ্ভাবন তুরস্ককে বিশ্ব প্রতিরক্ষা মানচিত্রে এক শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। আধুনিক রণাঙ্গনে যেখানে প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বা স্মার্ট ওয়ারফেয়ার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, সেখানে ন্যানোআল্প তুরস্কের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ট্রাম্পকার্ড হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।

